প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা প্রতিদিনই নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং মৌসুমি দুর্ভোগ—সব মিলিয়ে সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বেশ কঠিন। এমন বাস্তবতায় ফেনীতে বিজিবির বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবা ও শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম সীমান্তবাসীর মাঝে এনে দিয়েছে স্বস্তি ও মানবিক আশ্বাস। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড ফেনী ব্যাটালিয়নের উদ্যোগে ছাগলনাইয়া উপজেলার যশপুর সীমান্ত ক্যাম্পে আয়োজিত এই ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে তিন শতাধিক মানুষ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন।
বুধবার ১৪ জানুয়ারি সকালে যশপুর সীমান্ত ক্যাম্প এলাকায় এই বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবা ও শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ফেনীস্থ ৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোশারফ হোসেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণেও বিজিবি কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই এই ধরনের মানবিক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিজিবি সূত্র জানায়, শীতের এই সময়ে সীমান্ত এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগে শীতজনিত রোগে। সর্দি, কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ নানা উপসর্গে আক্রান্ত রোগীরা এই মেডিক্যাল ক্যাম্পে চিকিৎসা নেন। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, পেটের সমস্যা, চর্মরোগসহ সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা রোগীদেরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হয়। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সীমান্ত এলাকায় অনেক সময় সহজে চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় না। নিকটবর্তী উপজেলা বা জেলা সদরে যেতে হলে সময় ও অর্থ—দুটোরই প্রয়োজন হয়, যা অনেক অসহায় মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে বিজিবির এই উদ্যোগ তাদের জন্য বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে এসেছে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের চিকিৎসা সেবা পাওয়ায় পরিবারগুলো স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি তীব্র শীতে কষ্টে থাকা অসহায় মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়। শীতার্ত মানুষের হাতে কম্বল তুলে দেওয়ার সময় আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অনেকেই বলেন, শীতের রাতে একটি কম্বলই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা। বিজিবির সদস্যদের এমন মানবিক আচরণে সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে কৃতজ্ঞতা ও আস্থার অনুভূতি আরও দৃঢ় হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ৪ বিজিবির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম খাঁনসহ বিজিবির অন্যান্য কর্মকর্তা, সদস্য এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। তাঁরা বিজিবির এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কাজে বিজিবির ভূমিকা দিন দিন আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
ফেনী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোশারফ হোসেন তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিজিবি কেবল একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়, এটি দেশের মানুষেরও অংশ। নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসকদের সহায়তায় সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ ও শিশুদের চিকিৎসা সেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়েছে, যাতে তারা এই কঠিন সময় কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষ নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করেন। তাদের জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি বিজিবিও নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও এই ধরনের বিনামূল্যের চিকিৎসা ক্যাম্প, মানবিক সহায়তা এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মনে করেন, বিজিবির এই উদ্যোগ সীমান্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে বাহিনীর সম্পর্ক আরও দৃঢ় করবে। এতে করে সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতাও বাড়বে। সাধারণ মানুষ যখন নিরাপত্তা বাহিনীকে পাশে পায়, তখন তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীত মৌসুমে সীমান্ত অঞ্চলে এ ধরনের মেডিক্যাল ক্যাম্পের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। কারণ এই সময় রোগের প্রকোপ বাড়ে, অথচ অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের ভার বহন করতে পারে না। বিজিবির এই কার্যক্রম তাই শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, বরং মানবিক দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সীমান্তবাসীদের অনেকেই জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে তারা উপকৃত হবেন। বিশেষ করে নারী ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হলে এলাকার সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে ফেনীর ছাগলনাইয়ার যশপুর সীমান্ত ক্যাম্পে বিজিবির বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবা ও শীতবস্ত্র বিতরণ কর্মসূচি সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনে সাময়িক হলেও স্বস্তির আলো জ্বালিয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বিজিবি যে জনগণের পাশে আছে—এই বার্তাই যেন আরও একবার স্পষ্ট হলো।