প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা প্রত্যেক মুমিনের জীবনের প্রধান লক্ষ্য। এই সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে অনন্য উপায় হলো মানুষকে ভালোবাসা, বিশেষ করে একমাত্র আল্লাহর জন্য। ভালোবাসা শুধুমাত্র একটি মানবিক আবেগ নয়; এটি ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন, যা জান্নাতের পথকে সুগম করে। ইসলামের মহত্ত্ব শুধু নামাজ, রোজা, হজ বা জাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের প্রতি সহানুভূতি, ক্ষমাশীল মনোভাব, ভালোবাসা ও কল্যাণকামীতার মধ্যেও ইবাদতের আত্মা নিহিত। তাই, আল্লাহর প্রিয় হয়ে ওঠার জন্য মানুষকে ভালোবাসা একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। (সুরা হুজুরাত, আয়াত ১০)। অর্থাৎ ঈমানের ভিত্তিতে একজন মুমিন অপর মুমিনকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, বরং মুমিনদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রক্ষা এবং কল্যাণকামিতা নিশ্চিত করার আহ্বান। যদি কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ দেখা দেয়, তবে তা সমাধান করার দায়িত্বও মুমিনদের ওপর থাকে। একে অপরকে সহানুভূতিশীলভাবে সমাধান করতে না পারলে ঈমান পূর্ণ হয় না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন ব্যক্তি নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা তার ভাইয়ের জন্যও পছন্দ না করা পর্যন্ত সে সত্যিকারের ঈমানদার হতে পারবে না (তিরমিজি, হাদিস ২৫১৫)। এই হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আত্মকেন্দ্রিকতা ঈমানকে পরিপূর্ণ করতে পারে না; প্রকৃত ও পূর্ণ ঈমানদার হতে হলে অন্যদের প্রতি ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতা থাকা প্রয়োজন।
আল্লাহর বান্দাদের প্রতি ভালোবাসা আল্লাহর নিজস্ব ভালোবাসা অর্জনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। হাদিসে এসেছে, দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। যেমন তুমি দুনিয়ার মানুষদের প্রতি দয়া করো, আসমানে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন (আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৪১)। একে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ আশীর্বাদ বলা যায়, যা মানুষের হৃদয়ে নম্রতা, প্রেম ও সহানুভূতি বৃদ্ধি করে। আল্লাহর জন্য মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করলে কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাওয়া যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যেসব ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে, তারা কিয়ামতের দিনে আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবেন, যেদিন পৃথিবীর আর কোনো ছায়া থাকবে না (বুখারি, হাদিস ৬৮০৬)।
ভালোবাসা কেবল ঈমানের চিহ্ন নয়, এটি মানুষের মন জয় করার শক্তিও বহন করে। দাওয়াতি কাজ থেকে শুরু করে সামাজিক ও পেশাগত প্রতিষ্ঠান সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে ভালোবাসা ও নম্রতা অপরিহার্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তুমি যদি কঠোর বা কঠিন হৃদয়ের হতো, তবে মানুষ তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যেত। তাই তাদের ক্ষমা করো, পরামর্শ গ্রহণ করো, কাজের পর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯)। অর্থাৎ ভালোবাসা ও নম্রতা শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়, বরং ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম।
মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা ও তাদের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করা আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার প্রধান উপায়। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তিনি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী (মু‘জামুল আওসাত, তাবারানি)। মানুষকে সাহায্য করা, হাসিমুখে কথা বলা, দুঃখ ভাগাভাগি করা এবং কল্যাণকামীতার মধ্য দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। প্রকৃত মুমিন তার হৃদয়কে অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষের আবর্জনা থেকে মুক্ত রাখে এবং মানুষের কল্যাণে মনোনিবেশ করে।
সর্বশেষে বলা যায়, আল্লাহর প্রিয় হওয়ার অনন্য উপায় হলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। এটি শুধু একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং ঈমানের পূর্ণতা ও আখিরাতে নিরাপত্তা অর্জনের চাবিকাঠি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে প্রকৃত মুমিন হওয়ার তাওফিক দান করুন, আমাদের অন্তরকে পাপাচার, অহংকার ও বিদ্বেষের আবর্জনা থেকে মুক্ত করুন এবং আমাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ প্রদর্শন করুন। আমিন।