প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝকঝকে হাসি কে না চায়! কিন্তু সেই উজ্জ্বল হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে বড় বিপদ। হঠাৎ করে দাঁতে ব্যথা বা সংবেদনশীলতা দেখা দিলে অনেকেই তা বয়সের সঙ্গে যুক্ত করে মনে করেন। তবে দাঁতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ক্ষতি প্রায়শই শুরু হয় মানুষের নিজস্ব দৈনন্দিন অভ্যাসের কারণে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শুধু ভারতে নয়, বিশ্বব্যাপী ডেন্টাল রোগীর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশের দাঁতে এনামেল ক্ষয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
দাঁতের এনামেল হলো আমাদের দাঁতের বাইরের শক্ত প্রাকৃতিক আবরণ। এটি দাঁতকে ব্যাকটেরিয়া ও খাদ্যবস্তু থেকে সুরক্ষা দেয়। একবার এই এনামেল নষ্ট হলে তা আর স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসে না। দাঁতের ডাক্তাররা জানিয়েছেন, দৈনন্দিন পাঁচটি অভ্যাস মানুষকে নীরবে ক্ষতি করতে পারে। এই অভ্যাসগুলো আমাদের সচেতন না হলে ধীরে ধীরে দাঁতের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, দাঁত হলুদ বা ফেটে যায়, এমনকি শিরশির এবং হালকা ব্যথা শুরু হয়।
প্রথমত, অনেকেই মনে করেন, দাঁত যত জোরে ব্রাশ করা হবে তত পরিষ্কার হবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। শক্ত ব্রাশ এবং অতিরিক্ত চাপ দাঁতের এনামেলকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। বাইরে থেকে কোনো পরিবর্তন দেখা না গেলেও ভিতরে ভিতরে দাঁত দুর্বল হয়ে যায়। ফলে সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং ঠান্ডা বা গরম খাবারের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নরম বা মাঝারি শক্তির ব্রাশ ব্যবহার করে হালকা হাতে দাঁত মাজলেই যথেষ্ট।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক খাদ্যাভ্যাসও দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে ভূমিকা রাখে। সোফট ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংক, লেবু বা কমলার রস, চা, কফি এবং মিষ্টি খাবার দাঁতের উপর অ্যাসিডের প্রভাব ফেলে। নিয়মিত ব্রাশ করলেও এই ক্ষতি পুরোপুরি রোধ করা যায় না। তবে সহজ কিছু অভ্যাস যেমন অ্যাসিডযুক্ত খাবার বা পানীয় খাওয়ার পর পানি দিয়ে কুলি করা বা স্ট্র ব্যবহার করা, দাঁতের এনামেল রক্ষায় সহায়তা করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দিনে একাধিকবার এমন অ্যাসিডযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে এনামেল দ্রুত ক্ষয় পেতে পারে।
তৃতীয়ত, শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকা। লালা বা স্যালাইভা আমাদের মুখের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। এটি মুখের অ্যাসিড কমিয়ে দাঁত মজবুত রাখে। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি না খেলে লালার কাজ কমে যায়। সারাদিন কফি, চা বা অ্যালকোহল গ্রহণ করলে এই সমস্যা আরও বাড়ে। তাই দিনের মধ্যে নিয়মিত পানি পান করাটাই দাঁতের সুরক্ষায় অন্যতম সহজ ও কার্যকর উপায়।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচলিত ঘরোয়া টোটকা বা হোম রেমেডি। অনেকেই লেবুর রস, বেকিং সোডা বা অ্যাক্টিভেটেড চারকোল ব্যবহার করে দাঁত সাদা করার চেষ্টা করেন। সাময়িকভাবে এটি দাঁত উজ্জ্বল দেখাতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এনামেল ক্ষয় হয়। ফলে দাঁত আরও হলুদ এবং সংবেদনশীল হয়ে যায়। নিরাপদ উপায় হলো দাঁতের ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা নেওয়া অথবা হালকা, ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করা।
পঞ্চমত, সব টুথপেস্টই সমান কার্যকর নয়। অনেকেই মনে করেন, যে কোনো ক্যাভিটি প্রটেকশন টুথপেস্টই যথেষ্ট। কিন্তু বেশিরভাগ সাধারণ টুথপেস্ট শুধু দাঁত পরিষ্কার করে, এনামেলকে শক্ত করে না। বিশেষভাবে এনামেল সুরক্ষার জন্য তৈরি টুথপেস্ট ব্যবহার করা জরুরি। অ্যাসিডযুক্ত খাবারের কারণে এনামেল নরম হয়ে গেলে দাঁত সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এনামেল ক্ষয় প্রাথমিকভাবে নীরবে ঘটে। তাই কোনো হঠাৎ লক্ষণ দেখা না দিলেও ধীরে ধীরে দাঁত দুর্বল হয়ে যায়। একটু বেশি জোরে ব্রাশ করা, বাড়তি এক কাপ কফি খাওয়া বা ভুল টুথপেস্ট ব্যবহার—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই শেষ পর্যন্ত দাঁতের এনামেল নষ্ট করে। একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসে না।
সঠিকভাবে দাঁতের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। নরম ব্রাশ ব্যবহার, হালকা হাতে দাঁত মাজা, অ্যাসিডযুক্ত খাবারের পর কুলি করা, দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং এনামেল সুরক্ষার টুথপেস্ট বেছে নেওয়া হলো এমন কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি। এগুলো মেনে চললেই দাঁতের এনামেল সংরক্ষণ করা সম্ভব এবং ঝকঝকে হাসি দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা যায়।
ডেন্টাল বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, দাঁতের এনামেল ক্ষয় প্রতিরোধে কেবল ব্রাশই যথেষ্ট নয়। খাদ্যাভ্যাস, পানি পান, টুথপেস্টের ধরন এবং ঘরোয়া টোটকা এড়িয়ে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট ভুল অভ্যাস, যেমন অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া বা শক্ত ব্রাশ ব্যবহার, দীর্ঘমেয়াদে দাঁতের স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু সাধারণ অভ্যাস দাঁতের এনামেল নষ্ট করতে পারে। তাই এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, যথেষ্ট পানি পান, সঠিক টুথপেস্ট ব্যবহার এবং নিরাপদ দাঁত পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষ তার দাঁতকে শক্তিশালী রাখতে পারে। ফলস্বরূপ শুধু স্বাস্থ্যকর নয়, বরং ঝকঝকে হাসিও দীর্ঘদিন ধরে রক্ষা করা সম্ভব।