প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের মসজিদ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় এ নীতিমালা প্রকাশিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পর প্রণীত এই নীতিমালাকে দেশের মসজিদভিত্তিক প্রশাসন ও ধর্মীয় সেবায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি এই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করে। নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে দেশের প্রখ্যাত আলেম-ওলামা, ইমাম-খতিব এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফা মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই নীতিমালার বিভিন্ন ধারা সংযোজন করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় দেশের মসজিদে কর্মরত খতিব ছাড়া অন্যান্য জনবলের জন্য গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত ছিল না। খতিবদের বেতন চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারণের কথা বলা হলেও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মসজিদ এবং পাঞ্জেগানা মসজিদের ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুযায়ী বেতন-ভাতা নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে ছোট ও বড় মসজিদের বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, সিনিয়র পেশ ইমাম জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ অনুযায়ী পঞ্চম গ্রেডে, পেশ ইমাম ষষ্ঠ গ্রেডে এবং ইমাম নবম গ্রেডে বেতন পাবেন। প্রধান মুয়াজ্জিনের জন্য দশম গ্রেড, মুয়াজ্জিনের জন্য একাদশ গ্রেড, প্রধান খাদিমের জন্য পঞ্চদশ গ্রেড এবং খাদিমের জন্য ষোড়শ গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে। এই গ্রেডভিত্তিক কাঠামো চালুর মাধ্যমে মসজিদে কর্মরত জনবলের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু বেতন কাঠামো নয়, নীতিমালায় মসজিদে কর্মরত জনবলের জীবনমান উন্নয়নের দিকটিও গুরুত্ব পেয়েছে। কর্মরতদের প্রয়োজন বিবেচনায় সামর্থ্য অনুযায়ী সপরিবারে আবাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে। একই সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎ কল্যাণ নিশ্চিত করতে মাসিক সঞ্চয়ের বিধান রাখা হয়েছে। চাকরি সমাপনান্তে এককালীন সম্মাননা প্রদানের নির্দেশনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে মসজিদে সেবা দেওয়া কর্মীদের জন্য একটি ইতিবাচক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ছুটি সংক্রান্ত বিষয়েও নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মসজিদে কর্মরত ব্যক্তিরা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি পঞ্জিকাবর্ষে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি এবং প্রতি ১২ দিনে এক দিন অর্জিত ছুটির বিধান রাখা হয়েছে। এতদিন ছুটির বিষয়ে সুস্পষ্ট নিয়ম না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ দেখা দিত; নতুন নীতিমালা সে সমস্যা দূর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, মসজিদের কোনো পদে নিয়োগের জন্য সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি বাছাই কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোনো পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে বেতন-ভাতা, দায়িত্ব ও চাকরিসংক্রান্ত অন্যান্য শর্ত উল্লেখ করে নিয়োগপত্র প্রদানের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এতে করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের নীতিমালায় প্রথমবারের মতো মসজিদে নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। নগর ও আধুনিক মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বিবেচনায় এই পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি নারীদের জন্য মসজিদে শরিয়তসম্মতভাবে পৃথক নামাজের কক্ষ বা স্থান ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা নারী মুসল্লিদের জন্য ধর্মীয় পরিবেশকে আরও সহায়ক করবে।
মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির কাঠামোও নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালায় কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ জন করা হয়েছে। তবে মসজিদের আয়, আয়তন ও অবস্থান বিবেচনায় সদস্য সংখ্যা কম বা বেশি করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে করে ছোট মসজিদ ও বড় মসজিদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হবে।
চাকরিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়েও নীতিমালায় সুস্পষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মসজিদে কর্মরত কোনো ব্যক্তি সংক্ষুব্ধ হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার অথবা সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। এছাড়া নীতিমালা বাস্তবায়নে কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা নিরসনের জন্য জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
এই নীতিমালা জারির মাধ্যমে ২০০৬ সালের মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালাটি বাতিল করা হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর নতুন নীতিমালা প্রণয়নের ফলে মসজিদ পরিচালনা ও জনবল ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা আসবে বলে আশা করছেন ধর্মীয় ও প্রশাসনিক মহল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের মসজিদগুলো কেবল ইবাদতের স্থান হিসেবেই নয়, বরং একটি সুসংগঠিত সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।