ভোটের প্রচার শুরুর তিন দিনেই সংঘর্ষ-লঙ্ঘনের হিড়িক, ইসির কঠোরতা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৮ বার
ভোটের প্রচার শুরুর তিন দিনেই সংঘর্ষ

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের প্রচার শুরু হতেই দেশজুড়ে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৫২টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রক্তাক্ত হয়েছেন তিন শতাধিক নেতাকর্মী। একই সময়ে নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ৪৫ জন প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে শোকজ আর অর্থদণ্ডের মধ্যেই কমিশনের পদক্ষেপ সীমাবদ্ধ থাকায় নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ হবে, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।

প্রচারের এই সহিংস প্রবণতা নতুন নয়। তফসিল ঘোষণার পর প্রচার শুরুর আগের সময়েও আচরণবিধি লঙ্ঘনের যেন এক ধরনের মহোৎসব চলেছে। তখন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ ছিল মূলত নামমাত্র জরিমানা আর শোকজ নোটিসে সীমাবদ্ধ। কমিশনের এই নমনীয়তা রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবারও যেন সেই পুরোনো গতানুগতিক পথেই হাঁটছে, এমন অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

নির্বাচনি মাঠে সহিংসতার পাশাপাশি আচরণবিধি মানার প্রবণতাও আশানুরূপ নয়। রঙিন পোস্টার, নির্ধারিত সময়ের বাইরে মাইক ব্যবহার, মোটরশোভাযাত্রা আর ট্রাক মিছিলের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ইসি’র মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে প্লাস্টিক লেমিনেটেড রঙিন পোস্টারের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। দুপুর দুইটার আগে ও রাত আটটার পর উচ্চশব্দে মাইক বাজিয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ করার অভিযোগও বাড়ছে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নজরদারিতে প্রতিটি আসনে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন রয়েছেন। পুলিশ ও আনসার বাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে বড় ধরনের গোলযোগ এড়ানো যায়। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার দাবি করেন, কমিশন কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশনের বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক স্পষ্ট। ফেমার সভাপতি ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মুনিরা খান মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের হাতে পর্যাপ্ত আইনগত ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াই বড় সমস্যা। শুধু শোকজ নোটিস আর জরিমানার মধ্যেই শাস্তি সীমাবদ্ধ থাকলে আচরণবিধি মানতে প্রার্থীদের আগ্রহ তৈরি হবে না। তাঁর মতে, সময় এখনো আছে, কমিশন চাইলে এখনই কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।

সংঘর্ষ ও লঙ্ঘনের ঘটনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। শেরপুর-১ আসনে আচরণবিধি ভেঙে রঙিন পোস্টার সাঁটানো ও অতিরিক্ত মাইক ব্যবহারের অভিযোগে তিন প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। সেখানে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থানীয় প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত রয়েছে। তবে ময়মনসিংহে পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ। প্রচারের শুরুতেই বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থককে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় ৩৮ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দলীয় কোন্দল নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ভোটকেন্দ্র পাহারার ডাক দেওয়ার পর স্থানীয় বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তিনি নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়ে জানিয়েছেন, তাঁর কর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে এবং প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন না।

সিলেটেও সহিংসতার চিত্র মিলেছে। জিন্দাবাজার এলাকায় হাতপাখা প্রতীকের একটি নির্বাচনি ক্যাম্পে হামলা ও মোটরসাইকেল ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিশোরগঞ্জে বিএনপির জনসভাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে, যেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি শুধু জরিমানায় সীমাবদ্ধ নয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে স্পষ্টভাবে বলা আছে, বিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থীর অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। গুরুতর বা বারবার লঙ্ঘনের ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে। বাস্তবে এই কঠোর বিধান খুব কম ক্ষেত্রেই প্রয়োগ হতে দেখা যায়, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নাগরিক সমাজে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে বাইরে থাকায় এবার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দাপট বেশি। প্রচার শুরুর আগেই অন্তত অর্ধশত স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিরুদ্ধে পেশিশক্তি প্রদর্শন ও ক্যাম্প ভাঙচুরের অভিযোগ জমা পড়েছিল। পাশাপাশি বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য ছোট দলের শতাধিক প্রার্থীও বিধিভঙ্গের তালিকায় ছিলেন।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৩০০ আসনে চূড়ান্তভাবে প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৮১ জনে। কমিশন দাবি করছে, তারা আচরণবিধি প্রতিপালনে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ৮ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৬৭টি নির্বাচনি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৯টি মামলায় চার লাখ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় কারাদণ্ডের আদেশও দেওয়া হয়েছে। তবুও মাঠের বাস্তবতায় সহিংসতা আর লঙ্ঘনের চিত্র কমছে না।

সব মিলিয়ে ভোটের প্রচার শুরুতেই সংঘর্ষ আর আচরণবিধি লঙ্ঘনের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশন যদি এখনই আইনগত ক্ষমতার পূর্ণ প্রয়োগ না করে, তবে সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত