শরিকদের ছাড়ে সমীকরণ বদল, মাঠ দখলে মরিয়া বিএনপির বিদ্রোহীরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। নির্বাচনি প্রচার শুরু হতেই জেলার ছয়টি আসন ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন সমীকরণ। প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের আসন ভাগাভাগি, পাশাপাশি বিএনপির একাধিক আসনে প্রার্থী না দেওয়া বা শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিতে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যারা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এবার মাঠে নেমেছেন আলাদা পরিচয়ে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ছয়টি সংসদীয় আসনে এবার মোট ৪৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপি চারটি আসনে সরাসরি প্রার্থী দিয়েছে। বাকি দুটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জোটসঙ্গীদের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট থেকেও কয়েকটি আসনে এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা চূড়ান্ত হয়েছেন। এই ছাড়ের রাজনীতির ফলে বিএনপির ভেতরকার অসন্তোষ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্বাচনি মাঠে।

হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন, নাসিরনগর, বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই আসনে ১৩টি ইউনিয়নে মোট ভোটার দুই লাখ ৭৫ হাজার ৬২৯ জন। এখানে বিএনপির প্রার্থী এমএ হান্নান ও জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক আমিনুল ইসলামের মধ্যে মূল লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে আলোচনায় আছেন বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী একেএম কামরুজ্জামান। স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব ও সাংগঠনিক শক্তিকে হালকাভাবে দেখছেন না কেউ। ফলে এখানে ভোটের লড়াই শেষ পর্যন্ত ত্রিমুখী হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন, সরাইল-আশুগঞ্জ, এবার সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্রগুলোর একটি। প্রায় পাঁচ লাখ ভোটারের এই আসনে বিএনপি নিজস্ব প্রার্থী দেয়নি। বরং জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবকে সমর্থন দিয়েছে। তিনি খেজুর গাছ প্রতীকে লড়ছেন। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট থেকে এনসিপির আশরাফ উদ্দিন মাহ্দী প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামা রুমিন ফারহানা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক প্রচারে রয়েছেন। তার অবস্থান ও বক্তব্য এই আসনে ভোটের সমীকরণ জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল লড়াই হবে রুমিন ফারহানা, বিএনপি সমর্থিত হাবিব এবং জামায়াত জোট প্রার্থীর মধ্যে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসন, সদর-বিজয়নগর, ভোটার সংখ্যায় জেলার সবচেয়ে বড় আসন। এখানে মোট ভোটার ছয় লাখ ২৪ হাজার ৪৮০ জন। বিএনপি প্রার্থী প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলকে এই আসনে বেশ শক্ত অবস্থানে দেখা হচ্ছে। জামায়াত জোটের প্রার্থী এনসিপির মো. আতাউল্লাহ হলেও অন্য দলগুলোর প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে ধারণা স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের। ফলে এখানে বিএনপি প্রার্থীর এগিয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন, কসবা-আখাউড়া, দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে বিএনপি থেকে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও শেষ পর্যন্ত সাবেক সংসদ সদস্য ড. মুশফিকুর রহমান চূড়ান্ত প্রার্থী হয়েছেন। জামায়াতের আতাউর রহমান সরকার এই আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। ভোটের মাঠে এই দুই প্রার্থীর লড়াই ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে বাড়তি উত্তেজনা বিরাজ করছে।

নবীনগর নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী আবদুল মান্নানের সঙ্গে মূল লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে দলেরই বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী নাজমুল হোসেনের। প্রায় চার লাখ ৭৪ হাজার ভোটারের এই আসনে জামায়াত জোট থেকেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমজাদ হোসাইন প্রার্থী হয়েছেন। তবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির ভেতরের বিভাজন, যা ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন, বাঞ্ছারামপুর, এবার বিএনপি সরাসরি প্রার্থী দেয়নি। দলটি সমর্থন দিয়েছে জোটসঙ্গী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকিকে। তিনি ‘মাথাল’ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তবে এখানে জামায়াতের প্রার্থী ও বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটের লড়াইকে ত্রিমুখী করে তুলেছে। ফলে এই আসনটিকে সবচেয়ে অনিশ্চিত আসনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, কৌশলগত কারণেই চারটি আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে এবং দুটি আসন জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শরিকদের জয়ী করতে বিএনপি সর্বাত্মক কাজ করছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আমির মোবারক হোসেন দাবি করেছেন, জোটের স্বার্থে তারা তিনটি আসনে প্রার্থী না দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে জোটপ্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন।

তবে বাস্তবতা হলো, এই ছাড়ের রাজনীতিই বিএনপির ভেতরে বিদ্রোহকে উসকে দিয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাঠে নেমেছেন। তারা মনে করছেন, দলীয় জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব। এই বিদ্রোহীরা কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নির্ভর করবে ভোটের দিন সাধারণ ভোটারদের মনোভাবের ওপর।

সব মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি আসনে এবারের নির্বাচন শুধু দল বনাম দল নয়, বরং জোটের সমীকরণ আর বিদ্রোহী রাজনীতির এক জটিল পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। শরিকদের ছাড়ে তৈরি হওয়া শূন্যতা কাজে লাগাতে বিএনপির বিদ্রোহীরা কতটা সফল হন, সেটিই এখন জেলার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

অন্যান্য সংবাদ

  1. ভোটের প্রচার শুরুর তিন দিনেই সংঘর্ষ-লঙ্ঘনের হিড়িক, ইসির কঠোরতা
  2. নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত