ডায়াবেটিসে ডাব: কতটুকু খেলে নিরাপদ ও উপকারী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
ডায়াবেটিসে ডাব: কতটুকু খেলে নিরাপদ ও উপকারী

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডায়াবেটিস এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে দৈনন্দিন খাবার নির্বাচনই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সামান্য অসতর্কতায় রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা হৃদ্‌রোগ, কিডনি সমস্যা, চোখের জটিলতা ও স্নায়ু ক্ষতির মতো নানা ঝুঁকি তৈরি করে। এই বাস্তবতায় ডায়াবেটিস রোগীরা প্রায়ই অনেক খাবারকে ‘নিষিদ্ধ’ তালিকায় ফেলে দেন। ডাব বা নারকেলও তার ব্যতিক্রম নয়। অনেকের ধারণা, ডাবে চর্বি ও ক্যালোরি বেশি হওয়ায় এটি ডায়াবেটিসে ক্ষতিকর। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। সঠিক পরিমাণ ও সঠিক উপায়ে খেলে ডাব ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদই নয়, বরং উপকারীও হতে পারে।

ডাব মূলত স্বাস্থ্যকর চর্বি, ফাইবার ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজে সমৃদ্ধ একটি প্রাকৃতিক খাদ্য। এতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সও কম। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স এমন একটি মানদণ্ড, যা বলে দেয় কোনো খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করা কত দ্রুত বাড়ে। ডাবের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম হওয়ায় এটি খেলে রক্তে চিনি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। এ কারণেই পুষ্টিবিদরা ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ডাব পুরোপুরি বাদ না দিয়ে সীমিত পরিমাণে খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ডাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ফাইবার। ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলে খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ ধীরে ধীরে বাড়ে। এতে ইনসুলিনের ওপর চাপ কম পড়ে এবং রক্তে শর্করার ওঠানামা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ও পরিমিত ফাইবার গ্রহণ করলে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ টেবিল চামচ বা আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম ডাব খাওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ। এই পরিমাণ ডাব শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়, কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করে না। তবে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ খাওয়া ঠিক নয়, কারণ ডাবে ক্যালোরি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে। নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলে ওজন বাড়ার ঝুঁকি থাকে, আর ওজন বেড়ে গেলে ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি দুটোই বৃদ্ধি পায়।

ডাবে থাকা চর্বির একটি বড় অংশ হলো মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড বা এমসিটি। এই ধরনের চর্বি শরীরে দ্রুত শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণে চর্বি হিসেবে জমা হয়। সাধারণ স্যাচুরেটেড ফ্যাটের তুলনায় এমসিটি শরীরের বিপাকক্রিয়ায় ভিন্নভাবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এমসিটি শক্তি জোগাতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি দেয়। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত খাওয়া কমে যায়, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি ইতিবাচক দিক।

ডাব শুধু চর্বি ও ফাইবারেই সমৃদ্ধ নয়, এতে রয়েছে ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম, আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ম্যাঙ্গানিজ শরীরের বিপাকক্রিয়া ও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি থাকে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র‍্যাডিক্যালের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি কমতে পারে।

তবে ডাব খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা মানা জরুরি। বাজারে পাওয়া অনেক নারকেলজাত পণ্য যেমন মিষ্টিযুক্ত নারকেল চিপস, ক্যান্ডিড কোকোনাট বা প্রসেসড নারকেল মিল্কে অতিরিক্ত চিনি ও কৃত্রিম উপাদান যোগ করা থাকে। এসব পণ্য ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সব সময় প্রাকৃতিক ও অপরিষ্কৃত ডাব বেছে নেওয়াই ভালো। রান্নায় ডাব ব্যবহার করলেও অতিরিক্ত তেল বা চিনি যোগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডাবকে একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে ধরা যায়, বিশেষ করে যখন এটি উচ্চ শর্করাযুক্ত মিষ্টি বা প্রসেসড স্ন্যাকসের পরিবর্তে খাওয়া হয়। অনেক সময় হালকা ক্ষুধা পেলে মানুষ বিস্কুট, কেক বা মিষ্টিজাত খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা রক্তে চিনি দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। সেই জায়গায় অল্প পরিমাণ ডাব ক্ষুধা মেটাতে পারে এবং একই সঙ্গে রক্তে শর্করার ওপর বড় প্রভাব ফেলে না।

তবে মনে রাখতে হবে, ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা একক কোনো খাবারের ওপর নির্ভর করে না। এটি একটি সামগ্রিক জীবনযাত্রার বিষয়, যেখানে সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও ওষুধ গ্রহণ—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডাব খাওয়ার আগে বা খাদ্যতালিকায় নতুন কিছু যোগ করার আগে ব্যক্তিগত চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করা সব সময়ই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ প্রত্যেক মানুষের শরীরের অবস্থা, ওজন, ডায়াবেটিসের ধরন ও ওষুধের মাত্রা ভিন্ন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডায়াবেটিসে ডাব সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। বরং সঠিক পরিমাণে ও সচেতনভাবে খেলে এটি হতে পারে একটি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। ভয়ের কারণে অযথা প্রাকৃতিক খাবার বাদ না দিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শের ভিত্তিতে খাদ্য নির্বাচন করাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত