প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল, রাখাইন রাজ্য — যা বহুকাল ধরে আরাকান নামে পরিচিত — আজ আর শুধু এক গৃহযুদ্ধের নাম নয়। এটি হয়ে উঠেছে এশিয়ার নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রস্থল। যে অঞ্চলের মানুষ একসময় চা-চাষ, মাছ ধরা আর বন্দরকেন্দ্রিক জীবিকা নিয়ে বাঁচত, সেই আরাকান এখন বিশ্বশক্তির লুকানো দ্বন্দ্বের ভয়াবহ মঞ্চ। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অভিসন্ধির জটিল ছায়া সেখানে পড়েছে, আর সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশ নিজেকে অনিশ্চয়তার কাঁটাতারে আটকে ফেলেছে।
রাখাইনের ভেতর দিয়ে চীনের কাইউকফিউ-ইউনান গ্যাস ও তেলের পাইপলাইন বহু বছর ধরেই তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প করিডর হিসেবে কাজ করছে। মালাক্কা প্রণালির পথ এড়িয়ে এই পাইপলাইনের কারণে চীন সহজেই বঙ্গোপসাগর থেকে জ্বালানি সরাসরি ইউনান প্রদেশে নিয়ে যেতে পারছে। অথচ এই করিডর এখন আর নিরাপদ নয়। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বড় অংশের দখল নিয়েছে এবং তাদের হামলার লক্ষ্য এখন শুধু মিয়ানমার সেনাবাহিনী নয়, চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থও। ফলে চীনের দিক থেকেও আরাকানের প্রতি নজর দ্বিগুণ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই করিডর যেন নিরাপদ না থাকে। কারণ মালাক্কা প্রণালি মার্কিন নৌ-শক্তির প্রভাবাধীন এলাকা। রাখাইনে অশান্তি মানেই চীনের জন্য বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার শঙ্কা, যা তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশকে চাপের মুখে ফেলবে। আর এই ছায়াযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সেনা পাঠাচ্ছে না, বরং আরাকান আর্মিকে কার্যত উৎসাহিত করছে — এমনই ইঙ্গিত মিলেছে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বাংলাদেশ সফর, রোহিঙ্গা নেতা আরসা প্রধানের বাংলাদেশে গ্রেপ্তার — এসবই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বাস করা প্রায় ১০ লাখ মানুষের ক্ষোভ আর হতাশাকে যেভাবে ব্যবহার করা যায়, তাতেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নিহিত থাকতে পারে। রাখাইনে রোহিঙ্গারা বহুদিন ধরে নির্যাতিত, আর এ সুযোগে যদি কোনো গোষ্ঠী চীনের পাইপলাইনে হামলা চালায় বা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীনের কৌশলগত করিডর। যদিও আরসাকে বহুদিন ধরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে দেখা হয়, নতুন করে আরএসও নামের আরেকটি গোষ্ঠীও সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যারা সরাসরি লড়াইয়ে জড়াচ্ছে।
এখন বাংলাদেশের অবস্থান হয়ে পড়েছে জটিল। চীনের অন্যতম ‘অঘোষিত মিত্র’ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বড় বিনিয়োগের আশ্বাস পেয়েছে — তিস্তা প্রকল্প থেকে নদী ব্যবস্থাপনায় ৫০ বছরের সহযোগিতা, চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন — সবই চীনের সরাসরি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায়। এমন বাস্তবতায় চীনের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ যুক্ত হবে — এটা চীন মেনে নেবে না, আবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপও বাংলাদেশ এড়িয়ে যেতে পারবে না।
আরও এক জটিল ধাক্কা এসেছে ভারতের দিক থেকে। ভারতের কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্ট — যা কলকাতা থেকে মিজোরাম পর্যন্ত বিকল্প বাণিজ্যিক পথ — রাখাইনের পালেটওয়া অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। আরাকান আর্মি এখন সেসব এলাকাও নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে দিল্লির বহুদিনের স্বপ্নও আজ যুদ্ধের মুখে পড়েছে। ভারতের স্বার্থ রক্ষায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অথচ যুক্তরাষ্ট্র যদি আরাকান আর্মিকে মদত দেয়, তাহলে একই মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বিরোধ দেখা দিতে পারে — যা অঞ্চলের শক্তির সমীকরণকেই অস্থির করে তুলবে।
আর বাংলাদেশ? রোহিঙ্গাদের বুকে প্রতিশোধের আগুন, সীমান্তে নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতের সম্ভাবনা, জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের হুমকি — সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ। এর মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার না করলে বড় ধরনের সংকট যে কোনো সময়ই দেখা দিতে পারে।
পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশকে এখন তিনটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে — সীমান্তে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া; আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সক্রিয় হয়ে রাখাইন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে জোর দেওয়া; আর যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের সঙ্গে এমন ভারসাম্য রক্ষা করা যাতে কোনো পক্ষই বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে না পারে।
এখন আর রাখাইন শুধু মিয়ানমারের সীমানা নয় — বাংলাদেশের অদৃশ্য অনিশ্চয়তা। এই অস্থির সময়ে শান্তিপূর্ণ ও সুসংহত পররাষ্ট্র নীতি আর সীমান্ত নিরাপত্তাই পারে বাংলাদেশকে নতুন এক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে। না হলে আরাকান একদিন বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা আর আন্তর্জাতিক অবস্থানকে এমন এক দুর্বলতার মধ্যে ফেলবে, যার ক্ষতি পোষানো সহজ হবে না।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন