কাজ ও জীবনের ভারসাম্য: মানসিক সুস্থতার ছয় সহজ পথ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৭ বার
কাজ ও জীবনের ভারসাম্য: মানসিক সুস্থতার ছয় সহজ পথ

প্রকাশ: ২৮  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডেডলাইন, নোটিফিকেশন আর শেষ না হওয়া দায়িত্বের চাপে আধুনিক জীবনের গতি যেন প্রতিদিন আরও দ্রুত হয়ে উঠছে। সকাল শুরু হয় অফিসের চিন্তায়, রাত শেষ হয় অসমাপ্ত কাজের চাপ নিয়ে। এর মাঝখানে হারিয়ে যাচ্ছে নিজের জন্য সময়, পরিবারের সঙ্গে মুহূর্ত, এমনকি নিজের মনের কথাও। কাজ আর ব্যক্তিগত জীবনের এই টানাপোড়েনে অনেকেই ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ক্লান্ত, বিষণ্ন ও দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কাজ ও জীবনের ভারসাম্য মানে একটিকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানো নয়। বরং কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে গ্রহণ করাই হলো সুস্থ ও অর্থপূর্ণ জীবনের চাবিকাঠি। হেলথ শটসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হ্যাপিনেস অ্যাম্বাসাডর ও আধ্যাত্মিক মেন্টর আত্মান ইন রবি বলেন, কাজ যদি জীবনের শত্রু হয়ে ওঠে, তবে মানসিক শান্তি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। কিন্তু কাজকে জীবনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তা হয়ে উঠতে পারে আনন্দ ও তৃপ্তির উৎস।

তিনি মনে করেন, কাজ-জীবনের ভারসাম্য কোনো একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন অভ্যাসই ধীরে ধীরে গড়ে তোলে মানসিকভাবে সুস্থ, শান্ত ও আনন্দময় জীবন। এই পথচলায় ছয়টি সহজ কিন্তু কার্যকর অভ্যাস বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

জাপানি জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘ইকিগাই’। এর অর্থ এমন একটি কারণ বা উদ্দেশ্য, যার জন্য মানুষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে। ইকিগাই হলো সেই জায়গা, যেখানে আপনার ভালোবাসা, দক্ষতা, দায়িত্ব ও জীবিকা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়। যখন মানুষ এমন কাজ করেন যা তিনি ভালোবাসেন এবং যেটাতে তিনি দক্ষ, তখন সেই কাজ আর কেবল দায়িত্ব থাকে না, বরং হয়ে ওঠে আত্মতৃপ্তির উৎস। কাজের প্রতি বিরক্তি কমে যায়, মানসিক চাপও অনেকটাই হ্রাস পায়।

কাজের বাইরেও প্রতিদিন জীবনের ছোট ছোট আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। একটি শান্ত সকালের চা, প্রিয় গান শোনা, বই পড়া বা প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় হাঁটা—এই ছোট মুহূর্তগুলোই জীবনে বড় প্রশান্তি এনে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় এমন কাজে ব্যয় করা উচিত যা মনকে হালকা করে এবং জীবনের সৌন্দর্য অনুভব করায়। একই সঙ্গে মাইন্ডফুলনেস বা সচেতন উপস্থিতির চর্চা মানসিক শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

ব্যস্ত জীবনের আরেকটি বড় সমস্যা হলো আমরা প্রায়ই নিজের শরীর ও মনের দিকে খেয়াল রাখি না। কাজের চাপে শ্বাস নেওয়ার কথাটাও যেন ভুলে যাই। মাইন্ডফুলনেস ও ধ্যান আমাদের বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে। প্রতিদিন মাত্র দশ মিনিটের ধ্যান বা নিঃশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক স্বচ্ছতা বাড়ায়, উদ্বেগ কমায় এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত ধ্যানচর্চা মানসিক শক্তি ও স্থিতিশীলতা গড়ে তোলে।

কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা আজকের সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। অফিস শেষ হলেও যদি ইমেইল, ফোনকল বা কাজের চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে, তবে বিশ্রাম কখনোই পূর্ণতা পায় না। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা, অফিসের বাইরে কাজসংক্রান্ত যোগাযোগ এড়িয়ে চলা এবং নিজের জন্য সময় নির্ধারণ করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এতে পরিবার, বন্ধু ও নিজের যত্নের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি হয়।

কৃতজ্ঞতার অভ্যাস কাজ-জীবনের ভারসাম্য রক্ষায় একটি শক্তিশালী উপায়। প্রতিদিন জীবনের অন্তত তিনটি বিষয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে মন ধীরে ধীরে ইতিবাচক হতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃতজ্ঞতা চর্চা মানসিক চাপ কমায়, সুখবোধ বাড়ায় এবং জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করে। কাজের চাপের মধ্যেও জীবনের ভালো দিকগুলো চোখে পড়তে শুরু করে।

মানুষ সামাজিক জীব। অন্যদের সঙ্গে সংযোগ ছাড়া মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা কঠিন। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীর সঙ্গে অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া মানসিক ভার লাঘব করে। কখনো কখনো একজন ভালো শ্রোতাই জীবনের বড় সমাধান হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মেন্টর খোঁজা বা আগ্রহভিত্তিক সামাজিক গোষ্ঠীতে যুক্ত হওয়া আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা জোগায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাজ ও জীবনের ভারসাম্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন। প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে বদলে দিতে পারে জীবনের গতি। কাজের সাফল্যের পাশাপাশি মানসিক শান্তি ও ব্যক্তিগত সুখ নিশ্চিত করতে পারলেই জীবন হয়ে উঠবে সত্যিকারের অর্থপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত