প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ওজন কমানো ও সুস্থ থাকার দৌড়ে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এখন বিশ্বজুড়ে অন্যতম জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ইনফ্লুয়েন্সার, ফিটনেস কোচ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা এই ডায়েটকে তুলে ধরছেন আধুনিক ও কার্যকর সমাধান হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই জনপ্রিয় পদ্ধতিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সার প্রীতি কাসিরেড্ডির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তার দাবি, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং তার শরীরের হরমোনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠছে—যা অনেকের জন্য উপকারী, সেটি কি নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য আদৌ নিরাপদ?
প্রীতি কাসিরেড্ডি সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে জানান, দীর্ঘদিন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনুসরণ করার পর তিনি বুঝতে পারেন, এটি তার জীবনের ‘সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তগুলোর একটি’। তার ভাষায়, নিয়মিত ফাস্টিংয়ের কারণে তার শরীরে ‘ফ্রি টি৩’ হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই হরমোন থাইরয়েডের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাত্রা কমে যাওয়ায় তার মেটাবলিজম ধীর হয়ে পড়ে, সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভূত হতো এবং ওজন কমার বদলে শরীর আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল।
শুধু তাই নয়, কাসিরেড্ডি জানান, সকালে তার কর্টিসল হরমোনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেত। কর্টিসল মূলত স্ট্রেস হরমোন হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন এটি বেশি থাকলে শরীর সার্বিকভাবে চাপের মধ্যে থাকে। এর ফল হিসেবে তিনি প্রায়ই ঠাণ্ডা অনুভব করতেন, মাসিকের রক্তস্রাব কমে গিয়েছিল এবং মানসিকভাবেও নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলেন না। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে নারীদের জন্য ‘বিপদের রেসিপি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
বিশেষ করে সকালের নাশতা এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেন। তার মতে, সকালে খাবার না খেলে শরীর শক্তির জন্য খাবারের পরিবর্তে কর্টিসলের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। এতে স্বল্পমেয়াদে হয়তো কাজ চালানো যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তার কথায়, ‘ব্রেকফাস্ট খাওয়া শুধু অভ্যাস নয়, এটি নারীদের জন্য একটি শক্তিশালী ও সুরক্ষামূলক সিদ্ধান্ত।’
এই বক্তব্য ঘিরেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে কি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং আদৌ নারীদের জন্য উপযোগী নয়? বিষয়টি বুঝতে হলে আগে জানতে হয়, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং আসলে কী এবং কেন এটি এত জনপ্রিয়।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং মূলত কী খাবেন, তার চেয়ে কখন খাবেন—এই সময়সূচির ওপর গুরুত্ব দেয়। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো ১৬:৮ মেথড, যেখানে ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা হয় এবং বাকি ৮ ঘণ্টার মধ্যে দিনের সব খাবার খাওয়া হয়। এই পদ্ধতির সমর্থকদের দাবি, এতে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়, ওজন কমে এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি কোমরের মাপ কমাতে, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে যাদের ওজনাধিক্য বা টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি রয়েছে।
তবে গবেষকরাও স্বীকার করছেন, এই উপকারিতাগুলো অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ক্যালরি নিয়ন্ত্রিত ডায়েটের মতোই। অর্থাৎ, দীর্ঘ সময় না খাওয়ার চেয়ে মোট ক্যালরি কমানোই আসল বিষয় হতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের প্রভাব নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। নয়ডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যালায়েড হেলথ সায়েন্স স্কুলের ডিন ডা. সুপ্রিয়া আওয়াস্থি বলেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং সব নারীর জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর নয়, তবে এটি সবার জন্য নিরাপদও নয়। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নারীদের হরমোন চক্র অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকাকে শরীর এক ধরনের স্ট্রেস হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, যার ফলে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়। এই বাড়তি কর্টিসল মাসিকের অনিয়ম, মুড সুইং এবং বিপাকক্রিয়া ধীর হওয়ার কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে যাদের পিসিওএস, থাইরয়েডের সমস্যা, অনিয়মিত মাসিক বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। ডা. আওয়াস্থির মতে, পরিকল্পনা ছাড়া বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি করে ফাস্টিং করলে নারীদের হরমোন নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সহজ কথায়, একজনের শরীরে যে পদ্ধতি কাজ করে, অন্য জনের ক্ষেত্রে সেটিই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
পুষ্টিবিদ ও আক্যা ওয়েলনেসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অক্ষিতা সিংলাও এই মতের সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, নারীদের শরীর ক্ষুধা ও কম শক্তি গ্রহণের মতো স্ট্রেসের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই বেশি সংবেদনশীল। তার মতে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিজে থেকে ক্ষতিকর নয়, কিন্তু পুষ্টির চাহিদা পূরণ না হলে এটি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এর ফলে পিএমএসের উপসর্গ বেড়ে যাওয়া, ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত ও অতিরিক্ত ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও বেশি জরুরি। ডা. আওয়াস্থির মতে, পিসিওএসে সাধারণত আগে থেকেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থাকে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এই সমস্যাগুলোকে কখনো কখনো আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে অক্ষিতা সিংলা মনে করেন, পিসিওএসে ওজন কমানো শুধু কম খাওয়ার বিষয় নয়। এতে হরমোন, প্রদাহ, মানসিক চাপ ও জীবনযাত্রার সামগ্রিক পরিবর্তন জড়িত। পর্যাপ্ত প্রোটিন, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, ভালো ঘুম ও স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ—এই সবকিছু মিলিয়েই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।
সব দিক বিবেচনায় বিশেষজ্ঞদের অভিমত প্রায় এক জায়গায় এসে মেলে। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নারীদের জন্য সব সময় খারাপ নয়, তবে এটি কোনো জাদুকরী সমাধানও নয়। অনেক নারীর ক্ষেত্রে এটি ওজন ও মেটাবলিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। আবার যাদের হরমোনজনিত সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ভুলভাবে বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি করে ফাস্টিং করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা তাই সতর্ক করছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড দেখে হুট করে খাবার বাদ দেওয়া বা শরীরকে দীর্ঘ সময় স্ট্রেসে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নারীদের শরীর ফাস্টিংয়ের প্রতি আলাদাভাবে সাড়া দেয়। তাই নিজের শরীরের সংকেত, পুষ্টির চাহিদা ও হরমোনের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পথ।