ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিন কতটা ফাইবার জরুরি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিন কতটা ফাইবার জরুরি

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা পরিচিত মানুষ ও জায়গা ভুলে যাওয়ার মতো সমস্যাকে আমরা অনেক সময় স্বাভাবিক বার্ধক্যের অংশ বলে ধরে নিই। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এসব উপসর্গ অনেক ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার পূর্বাভাসও হতে পারে। বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে এই স্নায়ুবিক রোগের প্রকোপ, যার বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে উঠে এসেছে, আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস—বিশেষ করে খাদ্যআঁশ বা ফাইবার গ্রহণ—ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

খাদ্যআঁশ এমন একটি পুষ্টি উপাদান, যা সরাসরি হজম না হলেও অন্ত্রের ভেতরে থাকা উপকারী জীবাণু বা মাইক্রোবায়োমকে সক্রিয় ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এই অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’। নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই যোগাযোগ যত সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে, আমাদের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা তত দীর্ঘদিন বজায় থাকে।

স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রোয়েট ইনস্টিটিউটের গাট মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক কারেন স্কটের মতে, মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্যতালিকায় ফাইবারের পরিমাণ বাড়ানো এখন আর শুধু পরামর্শ নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন। তিনি বলেন, ফাইবারের ঘাটতি শুধু হজমজনিত সমস্যাই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুবিক অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়ায়। অথচ বাস্তবতা হলো, বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ মানুষই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম আঁশ গ্রহণ করছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৯০ শতাংশ নারী দৈনিক প্রস্তাবিত ফাইবারের পরিমাণ পূরণ করতে পারেন না। তাদের বেশির ভাগই প্রয়োজনের অর্ধেকেরও কম আঁশ খান। যুক্তরাজ্যে এই চিত্র খুব একটা ভিন্ন নয়; সেখানে ৯০ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ফাইবারের ঘাটতিতে ভুগছেন। উন্নত দেশের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, আর বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ভাতনির্ভর খাদ্যাভ্যাস, শাকসবজি ও ফলের অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি ঝোঁক আমাদের খাদ্যতালিকায় আঁশের ঘাটতি বাড়াচ্ছে।

মস্তিষ্ক রক্ষায় ফাইবারের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক স্কট বলেন, উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ায়। এসব ব্যাকটেরিয়া ফাইবার ভেঙে যে শর্ট-চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিউটিরেট। এই বিউটিরেট অন্ত্রের আস্তরণকে শক্তিশালী করে, প্রদাহ কমায় এবং ক্ষতিকর উপাদান রক্তপ্রবাহে ঢুকে মস্তিষ্কে পৌঁছানোর ঝুঁকি হ্রাস করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের কোষ সুরক্ষিত থাকে।

স্কটের ভাষায়, ‘আপনি যত বেশি আঁশ খাবেন, অন্ত্রে তত বেশি বিউটিরেট তৈরি হবে। আর বিউটিরেট যত বেশি হবে, মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি তত ভালো থাকবে।’ এই ধারণার পেছনে এখন শক্ত গবেষণালব্ধ প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

২০২২ সালে প্রকাশিত একটি বড় গবেষণায় তিন হাজার সাতশোর বেশি প্রাপ্তবয়স্ককে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, যাদের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত উচ্চমাত্রার ফাইবার ছিল, তাদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিপরীতে, যারা দীর্ঘদিন কম আঁশযুক্ত খাবার খেয়েছেন, তাদের মধ্যে স্মৃতিভ্রংশ ও জ্ঞানীয় অবনতির হার বেশি ছিল। একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ওপর করা আরেকটি গবেষণায়, যেখানে উচ্চ আঁশ গ্রহণকারীদের মানসিক সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো ছিল।

শুধু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণাই নয়, সাম্প্রতিক একটি র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল এই সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করেছে। যমজদের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা যায়, যারা প্রতিদিন প্রোবায়োটিক আঁশের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেছিলেন, তিন মাস পর তাদের স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানীয় দক্ষতা প্লাসেবো গ্রহণকারীদের তুলনায় উন্নত ছিল। প্রোবায়োটিক আঁশ এমন এক ধরনের ফাইবার, যা বিশেষভাবে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

মল নমুনা বিশ্লেষণে গবেষকরা দেখতে পান, এই সাপ্লিমেন্ট অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে বিফিডোব্যাকটেরিয়ামের মতো উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেড়েছে, যা বিউটিরেট উৎপাদনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

গবেষণাটির পরিচালক এবং কিংস কলেজ লন্ডনের জেরিয়াট্রিক মেডিসিনের ক্লিনিক্যাল লেকচারার মেরি নিই লকলিন বলেন, ‘বয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে খাদ্যকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি।’ তার মতে, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—এটি পরিবর্তনযোগ্য। অর্থাৎ, সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব।

লকলিন আরো বলেন, বার্ধক্যজনিত জ্ঞানীয় ও শারীরিক অবনতির ক্ষেত্রে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে গবেষণার বড় সুযোগ রয়েছে। ‘এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখান থেকে আমরা দ্রুত নতুন জ্ঞান পাচ্ছি। ভবিষ্যতে এই জ্ঞান ব্যবহার করে বার্ধক্যকে আরো স্বাস্থ্যকর ও সহজ করে তোলা সম্ভব হতে পারে।’

গবেষণাগুলোতে আরো দেখা গেছে, বিউটিরেট উৎপাদন বেশি হলে তা শুধু স্মৃতিশক্তি নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি বিষণ্নতা কমাতে, ঘুমের মান উন্নত করতে এবং সামগ্রিক জ্ঞানীয় কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। বিউটিরেট উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মানসিক সুস্থতার সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়। এমনকি মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।

অধ্যাপক স্কটের দল সম্প্রতি আলঝাইমার রোগীদের মল নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখেছে, তাদের অন্ত্রে প্রদাহজনিত সূচক তুলনামূলক বেশি এবং বিউটিরেট উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কম। একই সঙ্গে বিউটিরেটের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কম পাওয়া গেছে। স্কট বলেন, ‘এটি বিউটিরেট ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের মধ্যকার সংযোগের ধারণাকে আরো শক্তিশালী করে।’ যদিও এসব গবেষণা এখনো সম্পর্কভিত্তিক, তবুও এগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটার পরিবর্তন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক গড়ে ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ উপকারী হতে পারে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সেই মাত্রা খুব কমই পূরণ হয়। ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত গ্রহণের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। এটি শুধু হজম বা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার জন্যও বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগ প্রতিরোধে কোনো একক সমাধান নেই। তবে গবেষণাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন—বিশেষ করে পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ—আমাদের স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। সুস্থ অন্ত্র মানেই সুস্থ মস্তিষ্ক—এই ধারণা এখন আর শুধু তত্ত্ব নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত একটি বাস্তবতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত