জুমার দিনে দরুদ পাঠ: রহমত ও নাজাতের অনন্য সুযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
জুমার দিনে দরুদ পাঠ: রহমত ও নাজাতের অনন্য সুযোগ

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসলামে জুমার দিনের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। এই দিনটিকে মহান আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় জুমা এমন একটি দিন, যেদিন রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের দরজা বিশেষভাবে উন্মুক্ত থাকে। ‘জুমা’ শব্দটির অর্থ একত্র হওয়া—আর এই নামের মধ্যেই নিহিত আছে মুসলিম সমাজের ঐক্য, সংহতি ও শৃঙ্খলার গভীর তাৎপর্য। এদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুমিন মুসলমানরা আল্লাহর ঘরে একত্রিত হয়ে নামাজ, দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পান।

পবিত্র কোরআনে জুমার দিনের গুরুত্ব অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মহান আল্লাহ সূরা জুমায় ইরশাদ করেছেন, হে ঈমানদারগণ! যখন জুমার দিন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা দ্রুত আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ করো। এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা বুঝতে পারো। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মূলত মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, দুনিয়াবি ব্যস্ততার ঊর্ধ্বে উঠে জুমার দিনে ইবাদতে মনোনিবেশ করাই প্রকৃত সফলতার পথ।

জুমার দিন শুধু ফরজ নামাজ আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই দিনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বহু ফজিলতপূর্ণ আমল। তন্মধ্যে অন্যতম হলো প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। দরুদ পাঠ এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। কোরআন ও হাদিসে দরুদ পাঠের গুরুত্ব এত বেশি যে, এটিকে মুমিনের জন্য রহমত লাভের এক অনন্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হাদিস শরিফে জুমার দিনে দরুদ পাঠের বিশেষ ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন আসরের নামাজের পর ৮০ বার দরুদ শরিফ পাঠ করবে, তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে এবং ৮০ বছরের নফল ইবাদতের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হবে। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলা কতটা দয়ালু এবং কত অল্প আমলের বিনিময়ে কত বড় প্রতিদান দান করেন, বিশেষত জুমার দিনের মতো বরকতময় সময়ে।

দরুদ শরিফ পাঠের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক শব্দমালা না থাকলেও কিছু দরুদ রয়েছে, যা বেশি ফজিলতপূর্ণ বলে আলেমরা উল্লেখ করেছেন। যেমন—
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَعَلَى آلِهِ وَسَلِّم تَسْلِيْمَا
এই দরুদ পাঠের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে নবীজির ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণের দোয়া করে, যা পরোক্ষভাবে নিজের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনে।

জুমার দিনে দরুদ পাঠের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এদিন পাঠ করা দরুদ সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পেশ করা হয়। হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবীজি বলেন, জুমার দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কারণ তোমাদের পাঠ করা দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়। তিনি আরও বলেছেন, কিয়ামতের দিন যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করবে, সে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে। এই হাদিস মুমিনের হৃদয়ে এক গভীর আশা ও ভালোবাসার জন্ম দেয়—যে আশায় সে রাসুলুল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য দরুদ পাঠে আরও মনোযোগী হয়।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, দরুদ পাঠ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি আত্মশুদ্ধির এক কার্যকর মাধ্যম। মানুষ প্রতিনিয়ত ভুল, গুনাহ ও অবহেলার মধ্যে ডুবে থাকে। কিন্তু দরুদ পাঠের মাধ্যমে তার হৃদয় নরম হয়, অন্তর আলোকিত হয় এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি তার আশা আরও দৃঢ় হয়। বিশেষ করে জুমার দিনে এই আমল করলে তা বহুগুণে ফলপ্রসূ হয়।

জুমার দিনকে দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। হাদিসে বর্ণিত আছে, এদিন এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা-ই চায়, আল্লাহ তা কবুল করেন। অনেক আলেমের মতে, সেই বিশেষ সময়টি হলো আসরের পর থেকে মাগরিবের আগ পর্যন্ত সময়। এ সময় দরুদ পাঠ, দোয়া, ইস্তিগফার ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন, গুনাহ মাফ এবং আখিরাতের মুক্তি কামনা করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেকেই জুমার দিনের এই ফজিলতগুলো ভুলে যান। কর্মব্যস্ততা, প্রযুক্তির আসক্তি এবং দুনিয়াবি চিন্তায় ডুবে থেকে আমরা অনেক সময় আল্লাহর এই বিশেষ নিয়ামতকে অবহেলা করি। অথচ একটু সচেতন হলেই জুমার দিনটি হতে পারে আমাদের জীবনের মোড় ঘোরানো এক সুযোগ। এই দিনে দরুদ পাঠের মাধ্যমে শুধু সওয়াবই অর্জিত হয় না, বরং হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে, জীবনের দুশ্চিন্তা হালকা হয় এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।

সবশেষে বলা যায়, জুমার দিন দরুদ পাঠ হলো মুমিনের জন্য এক অপার নিয়ামত। এটি এমন একটি আমল, যা অল্প সময় ও সামান্য প্রচেষ্টায় অসংখ্য সওয়াব, গুনাহ মাফ এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নৈকট্য লাভের সুযোগ এনে দেয়। তাই আসুন, আমরা সবাই জুমার দিনের প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করি এবং এই বরকতময় দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠের মাধ্যমে নিজেদের দুনিয়া ও আখিরাতকে আলোকিত করি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত