প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হৃদ্যন্ত্র মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রতিনিয়ত রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে এই অঙ্গটি। অথচ আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে হৃদ্রোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদ্রোগ। বাংলাদেশেও নীরবে বাড়ছে এই রোগের প্রকোপ। তবে আশার কথা হলো—সঠিক জীবনযাপন ও সচেতন খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে হৃদ্যন্ত্রকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব।
চিকিৎসকদের মতে, হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখার জন্য শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। বরং খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা সবচেয়ে কার্যকর ও প্রাকৃতিক উপায়। করোনারি ধমনিতে চর্বি জমে গেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। তাই হৃদ্বান্ধব খাবার বলতে বোঝায় এমন খাদ্য, যা কম লবণ, কম তেল-চর্বি ও চিনিমুক্ত, অথচ পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু নির্দিষ্ট খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে। তেমনই পাঁচটি খাবার নিয়ে আলোচনা করা হলো, যেগুলো হার্ট সুস্থ রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
তিসি বীজ হৃদ্যন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি প্রাকৃতিক খাদ্য। এতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও লিগন্যান রয়েছে। লিগন্যান শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিকেলের প্রভাব থেকে রক্ষা করে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এতে থাকা আঁশ হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। অতিরিক্ত ওজন হৃদ্রোগের অন্যতম বড় ঝুঁকি হওয়ায় তিসি বীজ নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস হার্টের জন্য উপকারী।
ফল ও শাকসবজি হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখার সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ উপায়গুলোর একটি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে তাজা ফল ও শাকসবজি রাখলে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পায়। পেঁপে, কমলা, আপেল ও বেরি জাতীয় ফল আঁশ, পটাশিয়াম ও ভিটামিন সি-তে সমৃদ্ধ। এসব উপাদান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং ধমনির স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখে। একইভাবে ব্রকলি, গাজর, পালংশাক, ফুলকপি, মিষ্টি আলু ও ঢেঁড়সের মতো সবজি আঁশসমৃদ্ধ হওয়ায় হৃদ্যন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়। নিয়মিত এসব খাবার খেলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়।
সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ হৃদ্যন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা হৃদ্যন্ত্রের প্রদাহ কমায় এবং ধমনিতে চর্বি জমতে বাধা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ গ্রাম সামুদ্রিক মাছে এক হাজার মিলিগ্রামেরও বেশি ওমেগা-৩ থাকতে পারে। এই উপাদান রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সহায়তা করে। শুধু সামুদ্রিক মাছ নয়, ইলিশ, রুই, কাতলা ও অন্যান্য তৈলাক্ত মাছেও ওমেগা-৩ পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের মতে, হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন মাছ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
বাদাম হৃদ্যন্ত্রের জন্য একটি আদর্শ স্ন্যাকস হিসেবে পরিচিত। কাঠবাদাম, কাজুবাদাম ও আখরোটে থাকা স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এতে থাকা আঁশ ও ভিটামিন ই হৃদ্যন্ত্রের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে। নিয়মিত অল্প পরিমাণ বাদাম খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শরীরের প্রদাহ কমে। তবে পরিমিত পরিমাণে বাদাম খাওয়া জরুরি, কারণ অতিরিক্ত খেলে ক্যালোরি বেড়ে যেতে পারে।
রসুন প্রাচীনকাল থেকেই হৃদ্রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রসুনে থাকা অ্যালিসিন নামক উপাদান রক্তচাপ কমাতে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এটি ধমনির স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতেও সহায়ক। বর্তমানে রসুনের সাপ্লিমেন্ট পাওয়া গেলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাজা রসুনই সবচেয়ে বেশি উপকারী। কারণ কুচি করা বা প্রক্রিয়াজাত রসুনে অ্যালিসিনের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়।
তবে শুধু ভালো খাবার খেলেই হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ক্ষতিকর খাবার এড়িয়ে চলাও জরুরি। অতিরিক্ত চিনি, গুড় ও উচ্চ শর্করাযুক্ত খাবার হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ট্রান্সফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার, ডুবো তেলে ভাজা খাবার ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য হৃদ্যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ রক্তচাপ বাড়িয়ে হার্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে সচেতন খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প নেই। নিয়মিত সঠিক খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ কমানো—এই চারটি অভ্যাস একসঙ্গে মেনে চললেই হৃদ্যন্ত্র দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব। ছোট ছোট পরিবর্তনই পারে বড় ধরনের হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে।