প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত জেফরি এপস্টেইন–সংক্রান্ত প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার গোপন নথি বিশ্ব রাজনীতি, করপোরেট ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এপস্টেইন কেলেঙ্কারি যেন এবার আরও বিস্তৃত ও গভীর রূপ নিয়ে সামনে এসেছে। নথিগুলোতে উঠে এসেছে বিশ্বের প্রভাবশালী ধনকুবের, রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপরিবারের সদস্য এবং গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত নানা বিস্ফোরক দাবি। যদিও এসব অভিযোগের বড় একটি অংশ এখনো যাচাই–বাছাইয়ের পর্যায়ে, তবুও প্রকাশিত তথ্য ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
নতুন নথিতে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক ও মাইক্রোসফটের সহ–প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। নথিতে দাবি করা হয়, এপস্টেইনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল এবং বিভিন্ন ইমেইল ও বার্তায় এমন সব কথোপকথন উঠে এসেছে, যা নৈতিকতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে মাস্ক ও গেটস—উভয়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং এটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নাম কলঙ্কিত করার চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন।
বিল গেটসকে ঘিরে নথিতে বলা হয়েছে, তিনি নাকি রুশ নারীদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন এবং এপস্টেইনের কাছে মাদক সংক্রান্ত সহায়তা চেয়েছিলেন। গেটস ফাউন্ডেশন এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছে, এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। একইভাবে ইলন মাস্কের ক্ষেত্রে দাবি করা হয়, ২০১২–১৩ সালের দিকে এপস্টেইনের দ্বীপে আয়োজিত তথাকথিত ‘সবচেয়ে বন্য পার্টি’ সম্পর্কে তিনি জানতে চেয়েছিলেন। মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে ‘পুরোনো মিথ্যা গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
নথিতে যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারও নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছে। প্রিন্স অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় এক নারী যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনেছেন। ভুক্তভোগী নারীর আইনজীবী ব্র্যাড এডওয়ার্ডস জানান, ২০১০ সালে এপস্টেইন তাঁকে যুক্তরাজ্যে পাঠান এবং অ্যান্ড্রুর তৎকালীন বাসভবন রয়্যাল লজে ওই ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারীর সঙ্গে রাত কাটানোর পর অ্যান্ড্রু তাঁকে বাকিংহাম প্যালেস ঘুরিয়ে দেখান। এর আগেও ভার্জিনিয়া জুফ্রে নামের এক নারী একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিলেন, যা ব্রিটিশ রাজপরিবারের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।
এই নথির আরেকটি চাঞ্চল্যকর অংশ জড়িয়ে আছে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে। ২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক খাসোগি হত্যার পর এপস্টেইনের একাধিক বার্তায় দাবি করা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজেড) নাকি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছিলেন। এপস্টেইন ঘটনাটিকে একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখতেন এবং দাবি করতেন, একটি ভিডিও ফুটেজ হ্যাক করে তথ্য ফাঁস করা হয়েছে। যদিও এসব দাবি এখনো প্রমাণিত নয়, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন করে সন্দেহ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এপস্টেইন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতেন এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এ তথ্য সামনে আসার পর এপস্টেইন কেবল একজন অপরাধী নাকি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের অংশ—এই প্রশ্ন আবারও জোরালো হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়েও নথিতে কিছু দাবি উঠে আসায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এপস্টেইনের ইমেইলে বলা হয়, মোদির ২০১৭ সালের ইসরায়েল সফর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে হয়েছিল এবং ২০১৯ সালে রিপাবলিকান কৌশলী স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে মোদির সাক্ষাৎ আয়োজনের চেষ্টাও তিনি করেছিলেন। ভারত সরকার এসব অভিযোগকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘একজন দণ্ডিত অপরাধীর কল্পনাপ্রসূত চিন্তা’ বলে আখ্যা দেয়। তবে বিরোধী দল কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেছে। নথিতে ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর নাম উঠে আসায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ইউরোপেও এই নথির প্রভাব স্পষ্ট। স্লোভাকিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাজকাক এপস্টেইনের সঙ্গে নারী ও কূটনীতি বিষয়ে বার্তা আদান–প্রদানের অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো পুরো ঘটনাকে রাজনৈতিক আক্রমণ বলে মন্তব্য করেছেন, তবুও পদত্যাগ প্রমাণ করে যে এপস্টেইন কেলেঙ্কারি এখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাস্তব প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নথিগুলো প্রকাশের মাধ্যমে এপস্টেইন কেলেঙ্কারি নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগগুলো সরাসরি প্রমাণিত না হলেও, ক্ষমতাবানদের সঙ্গে অপরাধী নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য যোগাযোগ বিশ্ববাসীর আস্থা ও নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, প্রকৃত অপরাধীরা এখনো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে এবং তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হচ্ছে কেবল কিছু নাম।
বিশ্ব রাজনীতি ও করপোরেট দুনিয়ায় এই কেলেঙ্কারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, জেফরি এপস্টেইনের ছায়া এখনো আন্তর্জাতিক ক্ষমতার অলিন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই নথি শুধু অতীতের অপরাধ নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতা কাঠামো, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ওপরও বড় ধরনের প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।