প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বলিউডে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ঠিক সেই সময়ে, নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় কমেডি অনুষ্ঠান ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কপিল শো’-এর বিশেষ পর্বে হাজির হলেন অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রহমান। তার উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে আনন্দের সঞ্চার করেছে, তবে একই সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কও উস্কে দিয়েছে। এই বিশেষ পর্ব আয়োজন করা হয়েছিল আসন্ন ছবি ‘গান্ধী টকস’-এর প্রচারের জন্য। অনুষ্ঠানে রাহমানের সঙ্গে ছিলেন অভিনেত্রী অদিতি রাও হায়দারি, অভিনেতা বিজয় সেতুপতি এবং কৌতুক অভিনেতা সিদ্ধার্থ যাদব।
প্রোমো প্রকাশের পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল—এই পর্বে রাহমান কি বিতর্কিত মন্তব্যের বিষয়ে সরাসরি কথা বলবেন? অনুষ্ঠানের শুরুতেই কপিল শর্মা মজার ছলে প্রয়াত লতা মঙ্গেশকরের একটি সিডিতে হাত রেখে রাহমানকে শপথ করান—সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এক লাইনে, এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তবে প্রশ্নোত্তর পর্বে রাহমান তার স্বভাবসুলভ সংযত ভঙ্গিতেই কথা বলেন। ক্রিকেট দেখেন কি না, নভজুত সিং সিধুকে চেনেন কি না—সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরও তিনি সচেতনভাবে বিতর্ক এড়িয়ে যান।
এর আগের কয়েক বছরে এক সাক্ষাৎকারে রাহমান ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, হিন্দি ছবিতে তার কাজ কমে যাওয়ার পেছনে ক্ষমতার কাঠামো বদলে যাওয়া এবং সাম্প্রদায়িক মানসিকতার ভূমিকা থাকতে পারে। এই মন্তব্য ঘিরেই তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। অনেকেই এটিকে বলিউডে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অভিযোগ হিসেবে দেখেছেন, আবার অনেকে বলেছেন, তিনি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো তুলে ধরেছেন, যা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিতর্ক তীব্র হওয়ার পর রাহমান নিজেও ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, তার উদ্দেশ্য কারও অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া নয় এবং তার মন্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কপিল শো–তে সরাসরি বিতর্কের প্রসঙ্গ না তোলার পরও, রাহমান ‘হুইস্পার গেম’-এর উদাহরণ টেনে বলেন, বার্তা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে পরিবর্তিত হয়। তিনি জানান, পৃথিবীর বড় সমস্যা হলো—তথ্য চলার পথে বিকৃত হয়ে যায়। এই বক্তব্যের মাধ্যমে দর্শকরা তার আগের মন্তব্যের প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছেন।
রাহমানের উপস্থিতি এবং সাবধানী বক্তব্যের পরও বিতর্ক থেমে যায়নি। বরং রাজনৈতিক পরিসর থেকে নতুন করে সমালোচনা এসেছে। মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী নীতেশ রানে প্রকাশ্যে এই অনুষ্ঠানের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাহমানের সাম্প্রতিক মন্তব্য ভারতীয় ও হিন্দু সমাজের ভাবাবেগে আঘাত করেছে। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিনোদনমূলক এত বড় মঞ্চে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত হয়নি। একই সঙ্গে মন্ত্রী ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কনটেন্ট নীতিমালার উপরও প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাহমানের সাবধানী ভঙ্গি এবং বিতর্ক এড়ানোর চেষ্টা এই পর্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলেও, এটি দর্শকদের মনে নতুনভাবে রাজনৈতিক আলোচনা উসকে দিয়েছে। শিল্পী হিসেবে তার নৈপুণ্য এবং সংযত ভঙ্গি প্রশংসার যোগ্য হলেও, সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বিষয়ক বিতর্ক অব্যাহত থাকায় সামাজিক মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়েছে।
অদিতি রাও হায়দারি, বিজয় সেতুপতি এবং সিদ্ধার্থ যাদবের সঙ্গে তার সংলাপ, হাস্যরসের পরিবেশ এবং সাধারণ দর্শকপ্রিয় উপস্থাপনা পুরো অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করেছে। কিন্তু রাহমানের উপস্থিতি এবং আগের মন্তব্যের প্রতিধ্বনি তাকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে শিল্পীর বক্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করতে পারে, যা কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কও সৃষ্টি করে।
উল্লেখযোগ্য যে, রাহমান তার বক্তব্যে কোনও দলের পক্ষে বা বিরোধিতার পক্ষে সরাসরি কিছু বলেননি। তবে তার সাবধানী ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দর্শকদের মনে তার আগের মন্তব্যের স্মৃতি উদ্রেক করেছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, প্রখ্যাত শিল্পীর প্রতিটি মন্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে দাঁড়ায়।
পরিশেষে, এ আর রহমানের উপস্থিতি কপিল শো–তে দর্শকদের জন্য আনন্দদায়ক হলেও, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংবেদনশীলতা নিয়ে নতুন বিতর্ককে উস্কে দিয়েছে। বিষয়টি নির্দেশ করে যে, ভারতীয় বিনোদন ও মিডিয়া প্রেক্ষাপটে প্রতিটি বড় ব্যক্তিত্বের বক্তব্য প্রায়শই সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।