রেকর্ডভাঙা অর্জন ও সংগীতের বৈচিত্র্যে ৬৮তম গ্র্যামি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৪ বার
রেকর্ডভাঙা অর্জন ও সংগীতের বৈচিত্র্যে ৬৮তম গ্র্যামি

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বসংগীতের সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে বিবেচিত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের ৬৮তম আসর এবার হয়ে উঠেছে রেকর্ড, বৈচিত্র্য ও নতুন ইতিহাস রচনার এক অনন্য মঞ্চ। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত এই জমকালো আয়োজন শুধু তারকাদের উপস্থিতিতেই নয়, বরং সংগীতের বহুমাত্রিক রূপ, ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তৃত প্রতিনিধিত্বের কারণেও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। আলো-ছায়ার মুগ্ধকর পরিবেশনা, আবেগঘন বক্তৃতা এবং স্মরণীয় পারফরম্যান্সে এবারের গ্র্যামি বিশ্বসংগীতের পরিবর্তনশীল মানচিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

বিশেষ করে লাতিন, হিপ-হপ, কেপপ ও সমসাময়িক পপ সংগীতের উত্থান এবারের গ্র্যামিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। দীর্ঘদিন ধরে যে মূলধারার বাইরে থাকা ঘরানাগুলো নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছিল, এবার তারা গ্র্যামির কেন্দ্রবিন্দুতেই উঠে এসেছে।

এবারের আসরের সবচেয়ে আলোচিত ও ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর একটি তৈরি করেন লাতিন র‌্যাপ সুপারস্টার ব্যাড বানি। তার অ্যালবাম ‘দেবি তিরার মাস ফতোস’ জিতে নেয় ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার। গ্র্যামির দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথম কোনো স্প্যানিশ ভাষার অ্যালবাম এই সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করল। ৩১ বছর বয়সী পুয়ের্তো রিকান এই শিল্পী এবারের আসরে মোট তিনটি গ্র্যামি জিতে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন। পুরস্কার গ্রহণের সময় দেওয়া তার আবেগঘন বক্তৃতা মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি এই অর্জন উৎসর্গ করেন স্বপ্নের টানে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমানো মানুষদের প্রতি, যা গ্র্যামির মঞ্চে মানবিক আবেগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

হিপ-হপ সংগীতের ইতিহাসেও এবারের গ্র্যামি হয়ে উঠেছে স্মরণীয়। মার্কিন র‌্যাপার কেনড্রিক লামার পাঁচটি গ্র্যামি জিতে ভেঙে দিয়েছেন হিপ-হপ শিল্পীদের মধ্যে সর্বাধিক গ্র্যামি জয়ের রেকর্ড। এতদিন এই কৃতিত্ব ছিল র‌্যাপ কিং জে-জির দখলে, যার মোট গ্র্যামি ছিল ২৫টি। কেনড্রিক লামার এখন ২৭টি গ্র্যামি নিয়ে এককভাবে শীর্ষে অবস্থান করছেন। তার এই অর্জন হিপ-হপ সংগীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন সমালোচকরা।

সমসাময়িক পপ সংগীতেও নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছেন বিলি আইলিশ ও ফিনিয়াস। ‘সং অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে বিজয়ী হয়েছে তাদের লেখা ও সুর করা গান ‘ওয়াইল্ডফ্লাওয়ার’। এটি এই মর্যাদাপূর্ণ বিভাগে তাদের তৃতীয় জয়। সংবেদনশীল কথা, পরিমিত সুর ও আধুনিক অ্যারেঞ্জমেন্টের কারণে গানটি শ্রোতা ও সমালোচকদের কাছে সমানভাবে প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘বেস্ট নিউ আর্টিস্ট’ হিসেবে গ্র্যামির মঞ্চে নতুন আলো ছড়িয়েছেন ব্রিটিশ গায়িকা অলিভিয়া ডিন। তার কণ্ঠের আবেগ, আরঅ্যান্ডবি ও পপ ঘরানার মিশেলে নিজস্ব সংগীতভাষা তাঁকে এই স্বীকৃতির যোগ্য করে তুলেছে।

এবারের গ্র্যামিতে বিশ্বসংগীতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছুঁয়েছে কেপপ। নেটফ্লিক্সের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘কে-পপ ডেমন হান্টারস’-এর গান ‘গোল্ডেন’ জিতেছে ‘বেস্ট সং রিটেন ফর ভিজ্যুয়াল মিডিয়া’ বিভাগে। গ্র্যামির ইতিহাসে এই প্রথম কোনো কেপপ গান এই বিভাগে পুরস্কৃত হলো। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, কেপপ আর শুধু আঞ্চলিক বা নির্দিষ্ট শ্রোতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এখন বিশ্বসংগীতের মূলধারার শক্তিশালী অংশ।

গ্র্যামিতে যুক্ত হওয়া নতুন বিভাগ ‘সেরা অ্যালবাম প্রচ্ছদ’-এ পুরস্কার জিতেছে টাইলার, দ্য ক্রিয়েটর-এর অ্যালবাম ‘ক্রোমাকোপিয়া’। সংগীতের পাশাপাশি ভিজ্যুয়াল শিল্পকেও গুরুত্ব দেওয়ার এই উদ্যোগকে অনেকেই গ্র্যামির সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

পপ ও ড্যান্স সংগীতের বিভাগে নিজের আধিপত্য আরও একবার প্রমাণ করেছেন লেডি গাগা। তার অ্যালবাম ‘মেহেম’ জিতেছে ‘সেরা পপ ভোকাল অ্যালবাম’ পুরস্কার। একই অ্যালবামের জনপ্রিয় গান ‘আবরাকাডাবরা’ জিতেছে ‘সেরা ড্যান্স-পপ রেকর্ডিং’ এবং ‘সেরা রিমিক্সড রেকর্ডিং’। শক্তিশালী প্রোডাকশন ও গাগার স্বতন্ত্র ভোকাল স্টাইল এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এবারের গ্র্যামিতে একটি ঐতিহাসিক অর্জন এসেছে চলচ্চিত্র জগত থেকেও। ‘সেরা মিউজিক ফিল্ম’ বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে তথ্যচিত্র ‘জন উইলিয়ামস’, যার প্রযোজকদের একজন কিংবদন্তি নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গ। এই জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি পূর্ণ করলেন বহুল আলোচিত ‘ইজিওটি’—অস্কার, গ্র্যামি, এমি ও টনি। ইতিহাসে মাত্র ২২তম ব্যক্তি হিসেবে এই বিরল কৃতিত্ব অর্জন করলেন স্পিলবার্গ।

আধ্যাত্মিক জগত থেকেও গ্র্যামির মঞ্চে এসেছে নতুন ইতিহাস। তিব্বতি ধর্মগুরু দালাই লামা প্রথমবারের মতো গ্র্যামি জিতেছেন ‘বেস্ট অডিওবুক ন্যারেশন’ বিভাগে। তার অডিও অ্যালবাম ‘মেডিটেশন: দ্য রিফলেকশন অব হিস হোলিনেস দ্য দালাই লামা’র জন্য এই সম্মাননা দেওয়া হয়। ৯০ বছর বয়সী এই আধ্যাত্মিক নেতার পক্ষে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন সংগীতশিল্পী রুফাস ওয়েনরাইট।

সিনেমার সংগীতেও সাফল্যের ছাপ রেখেছে অস্কারে আলোচিত ছবি ‘সিনার্স’। গ্র্যামির মঞ্চে ছবিটি জিতেছে ‘সেরা কম্পাইলেশন সাউন্ডট্র্যাক’ ও ‘সেরা আবহসংগীতের অ্যালবাম (ভিজ্যুয়াল মিডিয়া)’—দুটি বিভাগেই।

রেকর্ডিং অ্যাকাডেমির আয়োজনে লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্রিপ্টো.কম অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত এই জমকালো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কমেডিয়ান ট্রেভর নোয়া। টানা ষষ্ঠ ও শেষবারের মতো গ্র্যামির সঞ্চালনায় থাকা নোয়া তার কৌতুক ও সংবেদনশীল উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।

সব মিলিয়ে, ৬৮তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস শুধু পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠানই নয়; বরং এটি বিশ্বসংগীতের বৈচিত্র্য, পরিবর্তন ও অন্তর্ভুক্তির এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত