সর্বশেষ :
ভোটারদের মন জয়ে সব সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি প্রার্থীদের সন্ধ্যায় নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে জামায়াত বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বমুখী দুগ্ধজাত পণ্যের দাম রিজার্ভ জোরদারে আরও ১৭১ মিলিয়ন ডলার কিনলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রার্থীর মৃত্যুতে কি নির্বাচন স্থগিত হয়, কী বলছে আইন বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার আটক, ন্যায়বিচারের আশা জামায়াত আমিরের লিবিয়ায় রাজনৈতিক সহিংসতা, গাদ্দাফির ছেলে সাইফ নিহত ভোটকেন্দ্রে বিএনসিসি নয়, সিদ্ধান্ত বদলালো নির্বাচন কমিশন শেরপুর-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের ইন্তেকাল গ্রিস উপকূলে অভিবাসন যাত্রার ট্র্যাজেডি, প্রাণ গেল ১৪ জনের

গ্রিস উপকূলে অভিবাসন যাত্রার ট্র্যাজেডি, প্রাণ গেল ১৪ জনের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৬ বার

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গ্রিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চিওস দ্বীপের উপকূলে মানবপাচার আর নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার এক হৃদয়বিদারক পরিণতি আবারও বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চিওসের মিরসিনিদি সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি এলাকায় অভিবাসীবাহী একটি দ্রুতগতির স্পিডবোটের সঙ্গে গ্রিস কোস্টগার্ডের টহল জাহাজের সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জন অভিবাসী নিহত হয়েছেন। উদ্ধার অভিযান শেষে সমুদ্র থেকে একে একে লাশ তোলা হয়, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুর উপস্থিতি ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে।

গ্রিসের স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় স্পিডবোটটিতে ইউরোপে প্রবেশের আশায় থাকা বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, নৌকাটি তুরস্ক উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। চিওস দ্বীপ তুরস্কের খুব কাছাকাছি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এই রুটটি মানবপাচারকারীদের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু বহুল ব্যবহৃত পথ হিসেবে পরিচিত। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, অনিরাপদ নৌযান এবং অদক্ষ চালকদের কারণে প্রায়ই এখানে দুর্ঘটনার খবর আসে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার দিকে কোস্টগার্ডের একটি টহল জাহাজ সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে স্পিডবোটটিকে থামানোর চেষ্টা করে। ঠিক সেই সময় দ্রুতগতিতে চলতে থাকা নৌকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে টহল জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই নৌকাটি উল্টে যায় এবং যাত্রীরা সাগরে ছিটকে পড়েন। অন্ধকার, ঠান্ডা পানি এবং হঠাৎ দুর্ঘটনার ধাক্কায় অনেকেই সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছাতে পারেননি।

গ্রিস কোস্টগার্ড জানায়, দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। টহল জাহাজ, অতিরিক্ত উদ্ধারকারী নৌযান এবং উপকূলীয় স্বেচ্ছাসেবক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে রাতভর তল্লাশি চালায়। কয়েক ঘণ্টার অভিযানে ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত অবস্থায় বেশ কয়েকজন অভিবাসীকে দ্রুত চিওস দ্বীপের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে সাতজন শিশু এবং দুইজন গর্ভবতী নারী রয়েছেন। তাদের শারীরিক অবস্থা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে, কারণ দীর্ঘ সময় ঠান্ডা পানিতে থাকার ফলে হাইপোথার্মিয়া এবং শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই দুর্ঘটনায় গ্রিস কোস্টগার্ডের দুইজন সদস্যও আহত হয়েছেন। উদ্ধার কাজের সময় কিংবা সংঘর্ষের ধাক্কায় তারা আঘাত পান বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদেরও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়া হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আশঙ্কামুক্ত। তবে চারজন অভিবাসীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছেন।

ঘটনার পর গ্রিস সরকারের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কোস্টগার্ডের ভূমিকা, স্পিডবোটটির যাত্রাপথ, যাত্রীসংখ্যা এবং মানবপাচার চক্রের সম্পৃক্ততা সবকিছুই এই তদন্তের আওতায় আসবে বলে জানানো হয়েছে। গ্রিসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, মানবপাচারকারীরা যেভাবে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তা বন্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নতুন করে ইউরোপের অভিবাসন সংকটের ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচতে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ ইউরোপে পাড়ি জমাতে চায়। বৈধ পথের অভাবে তারা বাধ্য হয় মানবপাচারকারীদের হাতে নিজেদের জীবন সঁপে দিতে। অনেকেই জানে এই যাত্রা মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ, তবুও আশার টানে তারা সমুদ্র পাড়ি দেয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ ও মানবিক পথ তৈরি না হলে এমন ট্র্যাজেডি বারবার ঘটবে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে, ভূমধ্যসাগর ইউরোপগামী অভিবাসীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী রুটে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর শত শত মানুষ এই সমুদ্রে প্রাণ হারায়, অনেকের লাশ আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যায় না।

চিওস দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জেলেরা ও স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তা তাদের মানসিকভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। একজন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক জানান, শিশুদের নিথর দেহ যখন তোলা হচ্ছিল, তখন চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এসব মানুষ অপরাধী নয়, তারা শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরাও ইউরোপে যাওয়ার পথে এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার শিকার হন। যদিও এই ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবুও অভিবাসন ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সচেতনতা বাড়ানো, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

গ্রিস উপকূলে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শুধু একটি সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। ১৪ জন মৃত্যুর পেছনে রয়েছে ১৪টি স্বপ্ন, পরিবার আর ভবিষ্যৎ। যারা বেঁচে গেছেন, তাদের স্মৃতিতে এই রাত দগদগে ক্ষত হয়ে থাকবে। বিশ্ব যখন উন্নয়ন আর মানবাধিকারের কথা বলে, তখন এমন ট্র্যাজেডি প্রশ্ন তোলে, আমরা কি সত্যিই মানবিক সমাধানের পথে এগোচ্ছি, নাকি সমুদ্রের ঢেউয়ের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের আর্তনাদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত