প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং রিজার্ভ শক্তিশালী করার ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে আরও ১৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিলামের মাধ্যমে এই ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবেই এই ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বুধবার ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সর্বশেষ নিলামে ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক অংশ নেয় এবং সেখান থেকে মোট ১৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার কেনা হয়। এই নিলামে ডলারের কাটঅফ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসেই এটি দ্বিতীয় দফা ডলার ক্রয়। মাসের শুরুতে প্রথম দফায় ডলার কেনার পর এবার আরও ১৭১ মিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ায় ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ক্রয় দাঁড়াল ৩৮ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলার। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে বেশ সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাজারে ডলারের চাপ তুলনামূলকভাবে কমেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক দফায় নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থবছরে এখন পর্যন্ত মোট কেনা হয়েছে ৪৩২ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৪.৩২ বিলিয়ন ডলারের সমান। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডলার কেনার এই ধারাবাহিকতা একদিকে যেমন রিজার্ভকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকিও কমাচ্ছে। তবে তারা এটাও বলছেন, ডলারের বিনিময় হার যাতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে না যায় বা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিলাম পদ্ধতির মাধ্যমে ডলার কেনায় বাজারে স্বচ্ছতা বজায় থাকে। কোন দামে এবং কোন ব্যাংক থেকে কত ডলার কেনা হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানা যায়। ফলে এককভাবে কোনো ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না এবং বাজারে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করছে, ডলার কেনার ফলে স্বল্পমেয়াদে টাকার ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় রেখে এবং বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করেই এই ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নিয়ে আলোচনা চলছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ডলার বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় আগ্রাসী নয় বরং হিসেবি নীতি অনুসরণ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, আরও ১৭১ মিলিয়ন ডলার কেনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সুযোগ তৈরি হলে তা কাজে লাগিয়ে রিজার্ভ শক্তিশালী করার পথেই তারা এগোচ্ছে। সামনে রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে এই নীতি কতটা জোরালোভাবে অব্যাহত থাকে।