এক সপ্তাহ অচল চট্টগ্রাম বন্দর, জটে অর্থনীতির চাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
এক সপ্তাহ ধরে অচল চট্টগ্রাম বন্দর

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর টানা এক সপ্তাহ ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর নিয়োগসংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শুরু হওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন এখন অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে রূপ নিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, বাজার সরবরাহ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে। বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ হাজারে, আর বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় শতাধিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বড় ধরনের সংকট অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যৌথ উদ্যোগে গত সপ্তাহে আন্দোলন শুরু হয়। প্রথমে দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মবিরতি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও কঠোর রূপ নেয়। টানা কয়েক দিন কর্মবিরতির পর একদিনের জন্য ২৪ ঘণ্টা অবরোধ এবং পরবর্তীতে লাগাতার কর্মসূচির ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। ফলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে যায়।

এই অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার সরকারি উদ্যোগ। গত ৩০ নভেম্বর এনসিটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগসংক্রান্ত একটি রিটের রায় দেন উচ্চ আদালত। রায়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপরই বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তুতি শুরু করে। ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্য তারিখও নির্ধারণ করা হয়। তবে এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে মাঠে নামেন বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা।

শ্রমিকদের দাবি, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি কৌশলগত প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও শ্রমিক দলের নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, শ্রমিকরা ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে এই আন্দোলনে নেমেছেন। বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া হলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে বলে তারা মনে করেন। সরকার স্পষ্টভাবে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ বাতিলের ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

অন্যদিকে আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষ। আন্দোলনে জড়িত ১৮০ শ্রমিক-কর্মচারীর তালিকা তৈরি করা হয় এবং পর্যায়ক্রমে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ১৬ জনকে পানগাঁও ও কমলাপুর আইসিডি হয়ে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বদলির আদেশ পাওয়া একজন শ্রমিকও এখনো চট্টগ্রাম ছাড়েননি।

এই টানাপোড়েনে বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। বর্তমানে জেটিতে কনটেইনারবাহী পাঁচটি এবং চারটি বাল্ক কার্গো জাহাজ বন্দরের চ্যানেলে আটকা আছে। বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজের সংখ্যা ১২০ ছাড়িয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এই সংখ্যা থাকে ৬০টির নিচে। ইয়ার্ডে জমে থাকা কনটেইনারের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে, ফলে নতুন করে পণ্য খালাসের জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।

শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, গত দুই দশকে টানা এক সপ্তাহ চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ থাকার নজির নেই। এভাবে চলতে থাকলে শুধু আমদানি-রপ্তানি নয়, বন্দরসংশ্লিষ্ট পরিবহন, শিপিং, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংসহ শত শত প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।

ব্যবসায়ী মহলও পরিস্থিতি নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, বন্দরের অপারেটর কে হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের কোনো আপত্তি নেই। তাদের একমাত্র চাওয়া দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা। এক সপ্তাহ আগেও যে বন্দর সচল ছিল, সেটি এখন পুরোপুরি স্থবির। জাতীয় অর্থনীতির চাকা যেন থেমে গেছে। এক ঘণ্টা বন্দর অচল থাকার কথাও কল্পনা করা যায় না, সেখানে পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে অচলাবস্থা চলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার তথ্য আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। সংগঠনটির সেক্রেটারি রুহুল আমিন শিকদার জানান, বর্তমানে অফডকগুলোতে রপ্তানিমুখী কনটেইনারের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি, আমদানি কনটেইনার প্রায় আট হাজার এবং খালি কনটেইনারের সংখ্যা ৫২ হাজার টিইইউএস ছাড়িয়েছে। তিনটি ক্ষেত্রেই ধারণক্ষমতার খুব কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছেছে ডিপোগুলো। কাজ বন্ধ থাকায় আপাতত সংখ্যা স্থিতিশীল থাকলেও বন্দর চালু হলে একসঙ্গে যে চাপ তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

এদিকে যে চুক্তির আশঙ্কায় বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, সেই চুক্তি এখনো স্বাক্ষরিত হয়নি। ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির দিনক্ষণ চূড়ান্ত হলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হয়। বন্দরসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, চুক্তির কয়েকটি শর্ত নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড আপত্তি তুলেছে। পাশাপাশি চলমান শ্রমিক আন্দোলনের কারণে সরকারও বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ধীরগতির কৌশল নিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা এখন কেবল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে একটি জাতীয় সংকটে। দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ না নিলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর কত দ্রুত সচল হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত