নির্বাচনি উত্তাপের ছায়ায় বাগাতিপাড়ায় রাজনৈতিক সহিংসতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
বাগাতিপাড়ায় নির্বাচনি সহিংসতা জামায়াত আহত

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায় আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বিএনপি কর্মীর হামলায় জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই সহিংসতা শুধু একটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং নির্বাচনি পরিবেশে সহনশীলতা ও রাজনৈতিক শালীনতার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

আহত ব্যক্তি কোয়ালীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম আলী সরকার (৫২)। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি নাটোরে অনুষ্ঠিতব্য সমাবেশ সামনে রেখে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার সময় তার ওপর এই হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত আনুমানিক ১১টার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত নাজমুল হক বাগাতিপাড়া সদর ইউনিয়নের যোগীপাড়া গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং নাটোর-১ (লালপুর–বাগাতিপাড়া) আসনের ধানের শীষ প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের সমর্থক হিসেবে এলাকায় পরিচিত। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি দায় স্বীকার করেনি।

হামলার সময় ইব্রাহিম আলী সরকারের বাম হাতের বাহুতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর জখমের কারণে তার হাতে ছয়টি সেলাই দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আঘাতটি গভীর হওয়ায় তাকে কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে হবে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে।

আহত ইব্রাহিম আলী সরকারের পরিবার জানিয়েছে, এই হামলা ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। পরিবারের একজন সদস্য বলেন, “আমরা কোনো সংঘাতে জড়িত নই। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে দলের কর্মসূচি পালন করছিলেন। হঠাৎ করে এভাবে হামলা চালানো অমানবিক।” পরিবারের পক্ষ থেকে বাগাতিপাড়া মডেল থানায় মৌখিক অভিযোগ জানানো হয়েছে। তারা দ্রুত লিখিত অভিযোগ দাখিল করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এ ঘটনার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনী মাঠে বিরোধী মত দমনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। দলটির এক স্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলাম। হামলার মাধ্যমে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।”

অন্যদিকে, ধানের শীষ প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল এ ঘটনায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি হামলার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি তার দলের সক্রিয় কর্মী কি না, সেটিও তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। তিনি বলেন, “নির্বাচনে সহিংসতার কোনো স্থান নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করবে—এটাই প্রত্যাশা।”

বাগাতিপাড়া মডেল থানার ডিউটি অফিসার মাহমুদুল হাসান জানান, অভিযোগকারীরা থানায় উপস্থিত হয়েছেন এবং আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করব এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না, তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়।

স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে এ ধরনের সহিংস ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, “রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেটি সহিংসতায় রূপ নিলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এখন সবচেয়ে জরুরি।”

নাটোর অঞ্চলে অতীতে নির্বাচনী সময় ঘিরে সহিংসতার নজির রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা প্রয়োজন। নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত রাখতে দলীয় কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সহিংসতা বাড়লে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে। একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই। রাজনীতির নামে রক্তপাত বন্ধ হওয়া দরকার।”

সব মিলিয়ে, বাগাতিপাড়ার এই হামলার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকির দিকটি নতুন করে সামনে এনেছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের শাস্তি এবং সব দলের সহনশীল আচরণই পারে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখতে। অন্যথায়, গণতন্ত্রের পথে এই ধরনের সহিংসতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত