প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবিকতা, শিষ্টাচার ও সামাজিক সৌহার্দ্য—এই তিনটি গুণ মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রকে যেমন আলোকিত করে, তেমনি একটি সমাজকে করে তোলে শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী। ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে এই মূল্যবোধগুলো প্রতিষ্ঠার জন্য যে নির্দেশনা দিয়েছে, তার অন্যতম প্রধান উৎস হলো পবিত্র কোরআনুল কারিম। কোরআনের আয়াতগুলো শুধু ইবাদতকেন্দ্রিক নয়; বরং পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ, অর্থনৈতিক লেনদেন ও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গভীর দিকনির্দেশনা প্রদান করে। মানবিকতা ও শিষ্টাচারের বিষয়ে কোরআনের এমনই এক অনুপম শিক্ষা তুলে ধরেছে সুরা বনি ইসরাঈলের ২৮ নম্বর আয়াত।
আয়াতটির শুরুতেই আল্লাহ তায়ালা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন তাঁর অসীম দয়া ও করুণার কথা। “পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে”—এই বাক্যটি শুধু একটি সূচনা নয়; বরং এটি মানুষের অন্তরে দয়া, সহানুভূতি ও কোমলতার বীজ বপন করে। এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন, যদি কোনো অভাবগ্রস্ত বা সাহায্যপ্রার্থী মানুষের কাছ থেকে তুমি মুখ ফিরাতে বাধ্য হও, কারণ তুমি নিজেও তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে অনুগ্রহের প্রত্যাশায় রয়েছ, তাহলে সেই মুখ ফিরিয়ে নেওয়াও যেন হয় নম্রতা ও ভদ্রতার সঙ্গে।
এই আয়াতের সরল অনুবাদে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ইসলাম কখনোই কর্কশতা, অবমাননা বা অহংকারকে অনুমোদন করে না। সাহায্য করতে না পারা কোনো অপরাধ নয়, বরং মানুষ হিসেবে এটি স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা প্রকাশের ধরনই একজন মুমিনের চরিত্রকে আলাদা করে তুলে ধরে। কোরআনের নির্দেশ হলো—অক্ষমতার অজুহাতে কাউকে অবজ্ঞা করা যাবে না; বরং নম্র ভাষায়, হৃদয়বান আচরণে নিজের অবস্থান জানাতে হবে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যায় তাফসিরে ইবন কাসিরের উদ্ধৃতি এই আয়াতের তাৎপর্যকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে। সেখানে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে সমগ্র উম্মতকে এই নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, কোনো সময় যদি কেউ সাহায্য চায় এবং দেওয়ার মতো কিছু না থাকে, তবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সময় যেন তাতে আত্মম্ভরিতা বা অপমানের সুর না থাকে। বরং নিজের অক্ষমতা ও পরিস্থিতি প্রকাশ করে কোমলভাবে কথা বলতে হবে। তাফসিরকার কাতাদা রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেন, প্রয়োজনে ভবিষ্যতে সাহায্য করার আশ্বাসও দেওয়া যেতে পারে, যাতে সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তি মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে।
এই কোরআনিক শিক্ষা আজকের সমাজের বাস্তবতায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রতিদিনই আমরা রাস্তাঘাটে, অফিসে, বাজারে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অনেক মানুষের মুখোমুখি হই, যারা কোনো না কোনোভাবে সাহায্যের হাত বাড়ায়। অনেক সময় বাস্তব কারণেই আমরা তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারি না। কিন্তু সেই ‘না’ বলার ভাষা যদি হয় রূঢ়, অবজ্ঞাসূচক বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ, তাহলে তা মানুষের আত্মসম্মানে গভীর আঘাত হানে। কোরআন আমাদের শেখায়, অর্থ সহায়তা দিতে না পারলেও যেন আমাদের কথা, দৃষ্টি ও আচরণে মমতা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজে প্রায়ই দেখা যায়—যাদের হাতে সম্পদ বেশি, তারাই অনেক সময় দরিদ্র ও অভাবী মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে কঠোর ভাষায় কথা বলে। ভিক্ষুক, দিনমজুর কিংবা সাহায্যপ্রার্থী মানুষদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয় যেন তারা সমাজের বোঝা। অথচ কোরআনের এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, মানুষের মর্যাদা তার সম্পদের পরিমাণে নয়, বরং তার আচরণ ও নৈতিকতায়। একজন ধনী যদি কর্কশ হয়, তবে সে আল্লাহর দৃষ্টিতে সম্মানিত নয়; আর একজন দরিদ্র যদি ধৈর্যশীল ও ভদ্র হয়, তবে তার মর্যাদা অনেক উঁচু।
ইসলামের মানবিক দর্শনে দয়া ও সহানুভূতি শুধু ঐচ্ছিক গুণ নয়; বরং এটি ঈমানেরই অংশ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।” এই হাদিসের আলোকে সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাহায্য করতে না পারলেও দয়ার ভাষা ব্যবহার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
এই আয়াতের শিক্ষা ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি দপ্তর, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক সংগঠনে যখন কোনো নাগরিক বা অসহায় ব্যক্তি সাহায্য চাইতে আসে, তখন যদি নিয়মের কারণে তাকে ফিরিয়ে দিতে হয়, সেখানেও মানবিক আচরণ অপরিহার্য। ভদ্র ভাষা, সহানুভূতিশীল দৃষ্টি ও সম্মানজনক ব্যবহার একজন মানুষের কষ্ট অনেকটাই লাঘব করতে পারে।
মূলত সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াত আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শন শেখায়। এটি আমাদের জানায়, ইসলাম বাস্তববাদী ধর্ম—এখানে মানুষের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মাঝেও নৈতিক সৌন্দর্য বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাহায্য করতে না পারা লজ্জার নয়, কিন্তু সাহায্যপ্রার্থীকে অপমান করা গুরুতর নৈতিক ব্যর্থতা।
আজকের প্রতিযোগিতামুখর ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজে এই কোরআনিক শিক্ষা যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়, তবে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা বহুগুণে বাড়বে। একটি সুন্দর সমাজ গড়তে শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন মানবিকতা ও শিষ্টাচারের চর্চা। কোরআনের এই আয়াত সেই পথই আমাদের সামনে তুলে ধরে—যেখানে না বলার মধ্যেও থাকে মমতা, আর অক্ষমতার মধ্যেও থাকে সম্মান।