প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজনীতি মানব সমাজ পরিচালনার একটি অপরিহার্য মাধ্যম। তবে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জন বা শাসন ব্যবস্থা নয়; এটি নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং মানবকল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের মৌলিক দিকনির্দেশনা প্রদত্ত আছে। বিশেষভাবে সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত ইসলামী রাজনীতির সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত। এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায় যে ক্ষমতা লাভের পর নেতৃত্ব কেমন দায়িত্ব পালন করবে এবং রাষ্ট্র কীভাবে জনকল্যাণ নিশ্চিত করবে।
আয়াতে বলা হয়েছে—‘তাদের যদি আমরা জমিনে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই হাতে।’ এই নির্দেশনা চারটি মৌলিক ভিত্তি ও একটি নৈতিক পরিণতির প্রতিফলন ঘটায়, যা ইসলামী রাজনীতিকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে কার্যকর করার পথ দেখায়।
নামের প্রথম ভিত্তি হলো নামাজ কায়েম করা। ইসলাম পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে, যার মধ্যে নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামাজ কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এবং আল্লাহভীতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সঠিকভাবে নামাজ পালনের মাধ্যমে মানুষ অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত থাকে, যা সমাজকে স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল রাখে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ (মানুষকে) অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।’
দ্বিতীয় ভিত্তি হলো জাকাত আদায়। জাকাত ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ, যা সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সমতা সৃষ্টি করে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এটি রাষ্ট্রকে ন্যায়পরায়ণ ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, ‘এবং তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ জাকাত প্রদানের মাধ্যমে সমাজের ভ্রান্ত অর্থনৈতিক ভারসাম্য ঠিক থাকে এবং অসহায়দের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়।
তৃতীয় ভিত্তি হলো সৎ কাজের আদেশ। ইসলামী রাজনীতির মূল দিক হলো সমাজে নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রচার করা। এটি রাষ্ট্রকে কেবল শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় নয়, বরং জনগণের কল্যাণে সক্রিয় রাখে। সৎ কাজের প্রসার সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও মানবিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি আদর্শ সমাজ নির্মাণে সহায়ক।
চতুর্থ ভিত্তি হলো অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। ইসলামী রাজনীতির এই দিক রাষ্ট্রকে দুর্নীতি, জুলুম, শোষণ ও নৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তোলে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ ইসলামকে একটি জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপান্তরিত করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা আবশ্যক, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। আর তারাই হবে সফল।’
এই চারটি মৌলিক ভিত্তিকে একটি নৈতিক পরিণতি সম্পৃক্ত করা হয়েছে—‘সব কাজের পরিণাম আল্লাহর হাতে’। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; এর চূড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। এই বিশ্বাস শাসকদের অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখে এবং রাজনীতিকে ইবাদত ও আমানতের মর্যাদায় উন্নীত করে। ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ক্ষমতার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা।
পরিশেষে, সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত ইসলামী রাজনীতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিপত্র হিসেবে তুলে ধরে। এখানে নৈতিকতা, অর্থনৈতিক ন্যায়, সামাজিক কল্যাণ ও আল্লাহভীতি—all মিলিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। ইসলামী রাজনীতি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি নয়; এটি মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের রাজনীতি। যেকোনো নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র যদি এই নীতিগুলো মেনে চলে, তবে সমাজে স্থিতিশীলতা, নৈতিকতা ও সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। ইসলামী রাজনীতি সেই দিক নির্দেশ করে, যা ব্যক্তি ও সমাজের সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করে এবং ক্ষমতার ব্যবহারকে মানুষের কল্যাণ ও আল্লাহভীতি অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করায়।