কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে রিযিক বৃদ্ধির ছয়টি পথ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫০ বার
কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে রিযিক বৃদ্ধির ছয়টি পথ

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রিযিক মানবজীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, সম্পদ, সুস্থতা, জ্ঞান এমনকি মানসিক প্রশান্তি—সবকিছুই রিযিকের অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম রিযিককে কেবল অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং একে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিশেষ নিয়ামত হিসেবে বিবেচনা করেছে। কোরআনে বারবার বলা হয়েছে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রিযিক দেন, যাকে ইচ্ছা সংকুচিত করেন। তবে সেই সঙ্গে তিনি কিছু নির্দিষ্ট আমল ও গুণাবলির কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো রিযিক বৃদ্ধি ও তাতে বরকত লাভের মাধ্যম।

বাস্তব জীবনে আমরা দেখি, অনেক মানুষ সীমিত উপার্জনেও শান্তি ও স্বচ্ছলতার সঙ্গে জীবন কাটান, আবার কেউ প্রচুর আয় করেও অস্থিরতায় ভোগেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এর কারণ কেবল আয় নয়, বরং রিযিকের বরকত। এই বরকতের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক জীবনাচরণে। নিচে সেই আলোকে রিযিক বৃদ্ধির ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পথ তুলে ধরা হলো।

তাকওয়া বা আল্লাহভীতি রিযিক বৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকা। যে ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে চলেন, তার জন্য আল্লাহ অচিন্তনীয় উৎস থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন।’ এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, তাকওয়া শুধু আখিরাতের মুক্তিই নয়, দুনিয়ার রিযিকেরও দরজা খুলে দেয়। হারাম বর্জন ও হালালের প্রতি যত্নবান হওয়া রিযিকের বরকত বৃদ্ধির অন্যতম শর্ত।

রিযিক বৃদ্ধির আরেকটি মৌলিক ভিত্তি হলো তাওয়াক্কুল—আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা। তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট হয়ে যান। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) তাওয়াক্কুলের একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, যদি মানুষ আল্লাহর ওপর যথার্থভাবে ভরসা করত, তবে পাখিদের মতোই তাদের রিযিক দেওয়া হতো—পাখিরা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে। এতে বোঝা যায়, চেষ্টা ও ভরসার সমন্বয়ই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

দান ও সদকা বাহ্যিক দৃষ্টিতে সম্পদ কমানোর মতো মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি রিযিক বৃদ্ধির এক বিস্ময়কর মাধ্যম। দান আসলে আল্লাহর সঙ্গে এক লাভজনক লেনদেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, সদকা সম্পদ কমায় না। বরং দান মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে, সমাজে ভারসাম্য আনে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অদৃশ্য বরকত নাজিল হয়।

কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া আদায়ও রিযিক বৃদ্ধির অন্যতম মূলনীতি। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার শুকরিয়া পছন্দ করেন। শুকরিয়া শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা নয়; বরং অন্তরে নিয়ামতের স্বীকৃতি এবং আমলের মাধ্যমে তার প্রকাশ। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেবো।’ এই আয়াত রিযিকের ধারাবাহিকতা ও বরকতের এক স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি। অকৃতজ্ঞতা যেখানে নিয়ামত কেড়ে নেয়, সেখানে কৃতজ্ঞতা রিযিককে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা রিযিক বৃদ্ধির আরেকটি শক্তিশালী মাধ্যম। গুনাহ মানুষের রিযিক আটকে দেয়—এ কথা বহু হাদিস ও ইসলামী বর্ণনায় পাওয়া যায়। নবী নূহ (আ.) তাঁর কওমকে ইস্তিগফারের মাধ্যমে রিযিক ও সন্তান বৃদ্ধির সুসংবাদ দিয়েছিলেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, তিনি তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন।’ রাসূলুল্লাহ (সা.)ও বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে তাকে রিযিক দেবেন।

পারিবারিক বন্ধন বা সিলাতুর রহমান রক্ষা করা রিযিক বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। আত্মীয়তার সম্পর্ক জোড়া লাগানো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক বৃদ্ধি পাক এবং জীবন দীর্ঘায়িত হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কারণ এটি রিযিকের বরকত নষ্ট করে দেয়।

এ ছাড়া বহু আলেম ও সালাফে সালেহিন সূরা ওয়াকিয়াহ নিয়মিত পাঠকে রিযিকের প্রশস্ততার একটি বরকতময় আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে এই সূরা পাঠের কথা প্রচলিত রয়েছে। যদিও রিযিক বৃদ্ধির মূল ভিত্তি আমল ও আনুগত্য, তবু এ ধরনের ইবাদত মানুষের অন্তরকে আল্লাহমুখী করে তোলে।

সবশেষে বলা যায়, রিযিক বৃদ্ধির প্রকৃত চাবিকাঠি কৌশল, হিসাব বা ব্যাংক ব্যালেন্সে নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্যে। তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, দান, শুকরিয়া, ইস্তিগফার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক—এই গুণগুলো একত্রে মানুষের রিযিককে শুধু বাড়ায় না, বরং তাতে বরকত ও প্রশান্তি এনে দেয়। রিযিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, তবে তা লাভের পথও তিনিই শিখিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজন কেবল আন্তরিক আমল ও দৃঢ় বিশ্বাস।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল, প্রশস্ত ও বরকতময় রিযিক দান করুন। আমীন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত