তারকা সন্তানের চাপ, চড়ের যন্ত্রণায় ভেঙেছিলেন অভিষেক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৯ বার
তারকা সন্তানের চাপ, চড়ের যন্ত্রণায় ভেঙেছিলেন অভিষেক

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তারকা পরিবারের সন্তান হওয়া মানেই বিলাসী জীবন, সহজ সাফল্য আর লাল গালিচায় হাঁটার সুযোগ—এমনটাই সাধারণ ধারণা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় এই ঝকঝকে কল্পনার সঙ্গে মেলে না। বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের ছেলে অভিষেক বচ্চনের জীবন তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। বাবার আকাশছোঁয়া খ্যাতির ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে যে মানসিক চাপ, অপমান আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে, তার অনেকটাই দীর্ঘদিন অজানা ছিল। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের তেমনই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনে আবারও আলোচনায় এসেছেন অভিষেক।

অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছা তার ছোটবেলা থেকেই ছিল—এমনটা ভাবেন অনেকেই। কিন্তু বাস্তবে গল্পটা ছিল ভিন্ন। খুব কম মানুষই জানেন, অভিষেক শুরুতে অভিনেতা হতে চাননি। তার স্বপ্ন ছিল কর্পোরেট জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি বিদেশে পড়াশোনা করতে যান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলেন একেবারেই ভিন্ন পথে। কিন্তু পারিবারিক পরিবেশ, পরিস্থিতি আর ভাগ্যের টান তাকে শেষ পর্যন্ত রুপালি পর্দার দিকেই নিয়ে আসে। অমিতাভ বচ্চনের ছেলে হয়ে জন্মানো যে সহজ নয়, সেটা তখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি অভিষেক।

বলিউডে পা রাখার পরই শুরু হয় তুলনার চাপ। প্রতিটি সিনেমা, প্রতিটি সংলাপ, এমনকি প্রতিটি অভিব্যক্তিতেও তাকে বাবার সঙ্গে তুলনা করা হতো। ‘অমিতাভের ছেলে হয়েও এমন অভিনয়!’—এমন মন্তব্য শুনতে হয়েছে বারবার। ক্যারিয়ারের শুরুতে একের পর এক ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ায় সমালোচনার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। অভিষেক নিজেও তখন নিজের জায়গা নিয়ে দারুণ অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন।

২০০২ সালের একটি ঘটনা তার জীবনে গভীর দাগ কেটে আছে। সেই সময় তার অভিনীত ‘শারাত’ সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে। ছবিটি দর্শকের কাছে কেমন গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে, সেটা নিজের চোখে দেখতে তিনি মুম্বাইয়ের একটি সিনেমা হলে যান। একেবারেই সাধারণ দর্শকের মতো, কোনো বাড়তি পরিচয় ছাড়াই হলে ঢুকে বসেন। সিনেমা শেষ হওয়ার পর হল থেকে বেরোনোর সময় হঠাৎ ঘটে যায় সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যা আজও তার স্মৃতিতে তাজা।

হল থেকে বেরিয়ে এক অচেনা মহিলা আচমকা অভিষেকের কাছে এসে তাকে সজোরে একটি চড় মারেন। মুহূর্তের মধ্যে হতভম্ব হয়ে যান তিনি। চড় মেরেই ওই মহিলা রাগের মাথায় বলে ওঠেন, তুমি তোমার পরিবারের জন্য কলঙ্ক, তোমার আর অভিনয় করা উচিত নয়। কথাগুলো যেন ছুরির মতো বুকে বিঁধে যায়। অভিষেক জানান, সেই মুহূর্তে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। একজন অভিনেতার কাছে দর্শকের প্রতিক্রিয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এমন প্রকাশ্য অপমান তাকে গভীরভাবে আহত করেছিল।

সেই সময় তার ক্যারিয়ার যে কতটা নাজুক অবস্থায় ছিল, এই ঘটনাই তার প্রমাণ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, বচ্চন পরিবারের সন্তান হিসেবে সব দরজা তার জন্য খোলা ছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি ব্যর্থতা তাকে দ্বিগুণ চাপের মুখে ফেলেছিল। অন্য অভিনেতাদের ব্যর্থতা যেখানে সময়ের সঙ্গে ভুলে যেত দর্শক, সেখানে অভিষেকের প্রতিটি ভুল হয়ে উঠত শিরোনাম।

এই ঘটনার পরও তিনি অভিনয় ছাড়েননি। বরং ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সময় লেগেছে, ভুল হয়েছে, ব্যর্থতা এসেছে, কিন্তু অভিষেক হার মানেননি। ‘যুবা’, ‘বনটি অর বাবলি’, ‘গুরু’, ‘দোস্তানা’র মতো ছবিতে নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, তিনি শুধু অমিতাভ বচ্চনের ছেলে নন, নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষমতাও তার আছে।

আজ যখন সেই চড় খাওয়ার ঘটনার কথা তিনি স্মরণ করেন, তখন মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝেছেন, ওই অভিজ্ঞতাও তাকে শক্ত করেছে। একজন শিল্পী হিসেবে মানসিকভাবে পরিণত হতে সাহায্য করেছে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, সেই মুহূর্তে কথাগুলো তাকে ভেঙে দিয়েছিল। তার আত্মবিশ্বাসে বড় আঘাত লেগেছিল।

তারকা সন্তানদের জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। অনেকেই মনে করেন, তাদের কোনো সংগ্রাম নেই, সবকিছুই সহজ। কিন্তু অভিষেকের গল্প সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। বাবার বিশাল ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে নিজের আলো খুঁজে পাওয়া যে কতটা কঠিন, সেটা তিনি হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন। প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়েছে, তিনি কেবল নামের জোরে নয়, নিজের পরিশ্রমেই জায়গা করে নিতে চান।

আজও অভিষেক বচ্চন নিজেকে সুপারস্টার দাবি করেন না। বরং একজন অভিনেতা হিসেবে শেখার পথে থাকার কথাই বেশি বলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি চরিত্রাভিনয়ের দিকে ঝুঁকেছেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কাজ করেছেন, নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই অভিযোজন ক্ষমতাই হয়তো তাকে টিকিয়ে রেখেছে।

সিনেমা হলে সেই অচেনা মহিলার চড় আজ তার জীবনের এক কঠিন অধ্যায় হলেও, সেটাই হয়তো তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। বাইরে থেকে জীবন যত ঝকঝকে মনে হোক না কেন, তারকা সন্তান হিসেবেও যে অপমান, হতাশা আর মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, অভিষেক বচ্চনের এই অভিজ্ঞতা তার বড় প্রমাণ। বলিউডের রঙিন দুনিয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সংগ্রামের গল্পগুলো খুব কমই সামনে আসে। অভিষেকের এই স্বীকারোক্তি সেই আড়ালটাই একটু সরিয়ে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত