ফেব্রুয়ারির শুরুতেই রেমিট্যান্সে জোয়ার, এলো ৫০ কোটি ডলার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৩ বার
ফেব্রুয়ারির শুরুতেই রেমিট্যান্সে জোয়ার, এলো ৫০ কোটি ডলার

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতেই প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধির খবর এলো। মাত্র চার দিনেই দেশে এসেছে ৫০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ছয় হাজার ১৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ডলারের বাজার ঘিরে নানা আলোচনার মধ্যেও এই অঙ্ক দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার দিক থেকে এই প্রবাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির প্রথম চার দিনে এই বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে শুধু বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারিতেই এসেছে প্রায় দুই হাজার ১৯৬ কোটি টাকা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম চার দিনে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ৪২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবাসীরা এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠাচ্ছেন। এই প্রবণতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে নীতিনির্ধারক মহল।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির এই ধারা শুধু ফেব্রুয়ারির শুরুতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে এক হাজার ৯৯৩ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল এক হাজার ৬৩৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ অর্থবছরজুড়েই রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক উন্নতি দেখা যাচ্ছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ইতিবাচক দিক।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সরকারের দেওয়া নগদ প্রণোদনা, হুন্ডি দমনে কঠোর নজরদারি এবং প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়া—সবকিছু মিলেই রেমিট্যান্স বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের আয় কিছুটা স্থিতিশীল হওয়াও এই প্রবাহ ধরে রাখতে ভূমিকা রাখছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও রেমিট্যান্সের এই বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখো প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবার-পরিজনের কথা ভেবেই কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠান। এই অর্থ দিয়ে গ্রামের বাড়িতে সংসার চলে, সন্তানের পড়াশোনা হয়, চিকিৎসা ব্যয় মেটানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সই হয়ে ওঠে একটি পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। তাই প্রবাসী আয়ের প্রতিটি ডলার শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন ও সংগ্রাম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেমিট্যান্স বাড়ার সুফল সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে পড়ে। ডলার সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। এই অবস্থায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লে রিজার্ভ শক্তিশালী হয়, আমদানির চাপ কিছুটা কমে এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রবাসী আয় বাড়ার এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে প্রবাসীদের আস্থা ধরে রাখা জরুরি। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু অঙ্ক বাড়লেই হবে না, এই রেমিট্যান্স কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদনমুখী খাতে প্রবাসী আয়ের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। আবাসন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ কিংবা উদ্যোক্তা তৈরিতে এই অর্থ বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে।

ফেব্রুয়ারির শুরুতেই যে ৫০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, তা মানসিকভাবেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাজারে ডলারের সরবরাহ কিছুটা বাড়লে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে স্বস্তি আসতে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতেও তারল্য পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ফেব্রুয়ারির প্রথম চার দিনে প্রবাসী আয়ের এই শক্তিশালী প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশার আলো। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসীরা যে দেশের পাশে আছেন, এই পরিসংখ্যান তারই প্রমাণ। নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ধারা ধরে রাখা এবং প্রবাসী আয়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রতিফলিত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত