প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের আবাসন খাতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গৃহঋণ ও আবাসন ঋণ পুনঃতপশিল সংক্রান্ত নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এখন থেকে কোনো গ্রাহকের গৃহঋণের সর্বশেষ কিস্তি অবশ্যই ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে এতদিন চালু থাকা ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ আর থাকছে না। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে পাঠিয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত আবাসন খাতে ঋণ পুনঃতপশিলের বিদ্যমান কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব গ্রাহক আর্থিক সংকট বা আয় কমে যাওয়ার কারণে গৃহঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধে সমস্যায় পড়েন, তাঁদের জন্য পুনঃতপশিলের মেয়াদ ও শর্ত নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে গ্রাহকের বয়সভিত্তিক ঝুঁকি, ব্যাংকের সম্পদ সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ভারসাম্য বজায় রাখার দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাধারণভাবে গৃহনির্মাণ বা আবাসন ঋণের মেয়াদ অন্যান্য খাতের তুলনায় অনেক দীর্ঘ হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য এই ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২২ সালে ঋণ পুনঃতপশিল ও পুনর্গঠন বিষয়ে জারি করা নির্দেশনার আলোকে ১০০ কোটি টাকার কম ঋণের ক্ষেত্রে পুনঃতপশিলের পর সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত পরিশোধের সময় বাড়ানোর সুযোগ ছিল। এই সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে গৃহঋণ পুনঃতপশিলের পর মোট পরিশোধের সময়সীমা বিদ্যমান ঋণের মেয়াদের চেয়েও কম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। ফলে অনেক গ্রাহক চাইলেও প্রয়োজন অনুযায়ী সময় বাড়াতে পারছিলেন না। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গৃহঋণ বা আবাসন ঋণ পুনঃতপশিলের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বিদ্যমান অবশিষ্ট মেয়াদের অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সময় বাড়াতে পারবে। অর্থাৎ কোনো গ্রাহকের যদি ঋণ পরিশোধে ১০ বছর বাকি থাকে, তাহলে প্রথম দফা পুনঃতপশিলে আরও তিন বছর সময় বাড়ানো যাবে। এর পাশাপাশি সর্বোচ্চ ছয় মাসের একটি গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে গ্রাহক সাময়িক আর্থিক চাপ কাটিয়ে উঠতে পারেন।
সার্কুলারে পুনঃতপশিলের বিভিন্ন ধাপও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম দফা পুনঃতপশিলে অবশিষ্ট মেয়াদের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সময় বাড়ানো যাবে। দ্বিতীয় দফায় এই সীমা হবে ২০ শতাংশ। তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় বিদ্যমান অবশিষ্ট মেয়াদের সমপরিমাণ সময় বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করা হয়েছে—মোট পরিশোধের সময়সীমা কোনোভাবেই মূল ঋণ মঞ্জুরির সময় নির্ধারিত মেয়াদের চেয়ে বেশি হতে পারবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বয়সসীমা। নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, ঋণের সর্বশেষ কিস্তি পরিশোধের তারিখ কোনোভাবেই গ্রাহকের বয়স ৬৫ বছর অতিক্রম করতে পারবে না। আগে এই সীমা ছিল ৭০ বছর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ের অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এ কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে বয়সসীমা কমিয়ে আনা হয়েছে।
এ ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পুনঃতপশিল করা ঋণ অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী পুনঃতপশিলের ক্রম প্রযোজ্য হবে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো গ্রাহক আগে একাধিকবার ঋণ পুনঃতপশিল করে থাকলে, নতুন ব্যাংক সেই ইতিহাস বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে ঘোষণাপত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে তথ্য গোপনের সুযোগ না থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, পুনঃতপশিলের আগে মূল ঋণ মঞ্জুরির সময়কার সব ডকুমেন্টেশন, আয়সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য প্রযোজ্য শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। এতে করে কাগজপত্রের ঘাটতি বা অসঙ্গতির কারণে ভবিষ্যতে কোনো আইনি বা আর্থিক জটিলতা তৈরি না হয়, সেটিই লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে গ্রাহকদের জন্যও একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করবে। আবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। গৃহঋণের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ নিজস্ব আবাসনের স্বপ্ন পূরণ করেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে সঠিক বয়সসীমা ও পরিশোধ কাঠামো না থাকলে তা ভবিষ্যতে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
অনেক গ্রাহকের জন্য নতুন নিয়ম কিছুটা কঠোর মনে হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ এতে গ্রাহকরা ঋণ নেওয়ার সময় থেকেই নিজের বয়স, আয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করবেন। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, গৃহঋণ পুনঃতপশিল সংক্রান্ত এই নতুন সার্কুলার বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। আবাসন খাতে ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ, যা গ্রাহক ও ব্যাংক উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।