সর্বশেষ :
আজ সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষি-উড়োজাহাজ চুক্তি স্বাক্ষর শিশুদের আসক্তি তৈরির অভিযোগে মেটা-ইউটিউবের বিরুদ্ধে মামলা জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা, ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার এক বছরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ঢাকা–১১ আসনে পোস্টার নয়, মানুষের মন জয়ের লড়াই বগুড়ায় বিএনপির ‘দুর্গে’ চ্যালেঞ্জ, তিন আসনে জামায়াতের কড়া লড়াই ৫০তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ, উত্তীর্ণ ১২ হাজার ৩৮৫ এপস্টিনের কোটি কোটি ডলারের সম্পদের উত্তরাধিকারী কারা রাজধানীর আসনে নারী প্রার্থীদের ইশতেহারে নাগরিক সংকটের অঙ্গীকার

জাপানের সঙ্গে ইপিএ: বাংলাদেশের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১২ বার
জাপানের সঙ্গে ইপিএ: বাংলাদেশের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি বা ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) সইকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সরকার ও ব্যবসায়ী মহল। দীর্ঘ সাত দফা আলোচনা ও দর-কষাকষির পর জাপানের রাজধানী টোকিওতে এই চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও। ১ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার বিশাল এই চুক্তিতে ২২টি অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ব, শ্রম, পরিবেশ এবং বিরোধ নিষ্পত্তিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়, বরং বাংলাদেশ ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও দৃঢ় করার একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করাই এর মূল লক্ষ্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইপিএ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের বাজার আরও স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক হবে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।

এই চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো শুল্ক সুবিধা। চুক্তি অনুযায়ী, প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যবধান থেকেই স্পষ্ট হয় যে চুক্তিটি বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক মারিয়া হাওলাদার এই চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এতে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা এবং মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়বে। তবে তিনি মনে করেন, এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে দেশের শিল্প ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর।

চুক্তির ২২টি অধ্যায়ের মধ্যে বড় একটি অংশ পণ্যের বাণিজ্য সহজীকরণ নিয়ে। এখানে অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার অঙ্গীকার রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশীয় শিল্প রক্ষার জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হলেও তা হবে সীমিত ও সময়বদ্ধ। উৎপত্তি বিধি, শুল্ক প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ অধ্যায়ে পণ্যের উৎস প্রমাণের নিয়ম স্পষ্ট করা হয়েছে, যাতে জালিয়াতি রোধ হয় এবং একই সঙ্গে প্রকৃত রপ্তানিকারকেরা সুবিধা পান।

সেবা ও বিনিয়োগ অধ্যায়কে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদেরা। এই অধ্যায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেবা খাতের জন্য জাপানের বাজারে প্রবেশের পথ কিছুটা সুগম হবে। একই সঙ্গে জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আরও স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত পরিবেশে বিনিয়োগ করতে পারবেন। দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগে বিরোধ সৃষ্টি হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান, প্রয়োজনে মধ্যস্থতা বা আরবিট্রেশনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।

ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও চুক্তিটি সময়োপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ই-কমার্স, অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও ই-চুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল বাণিজ্য আরও সহজ ও নিরাপদ হবে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে, যা আধুনিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।

সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করার বিষয়টি চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর ফলে বাংলাদেশের যোগ্য আইটি, প্রকৌশল ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জাপানের সরকারি কেনাকাটায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে জাপানি কোম্পানিরাও বাংলাদেশের সরকারি প্রকল্পে অংশ নিতে পারবে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে।

মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ অধ্যায় নিয়ে কিছুটা উদ্বেগও আছে। কপিরাইট, পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও শিল্প নকশা সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা বাড়বে। যদিও বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় পাবে, তবু দীর্ঘমেয়াদে আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টিকে থাকতে এটি অনিবার্য।

বাংলাদেশের জন্য লাভের দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুল্কমুক্ত সুবিধার ফলে পণ্যের দাম কমবে এবং জাপানের মতো উচ্চমানের বাজারে প্রতিযোগিতা সহজ হবে। রপ্তানির সময় ও খরচ কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। জাপান বর্তমানে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বহুমুখীকরণে আগ্রহী, যা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে মান, সময়ানুবর্তিতা ও প্রযুক্তিতে উন্নতি জরুরি।

একই সঙ্গে ঝুঁকিও কম নয়। বাংলাদেশকেও ধাপে ধাপে জাপানি পণ্যে শুল্ক কমাতে হবে, যা রাজস্ব আয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। শুল্ক কমলে জাপানি যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্য তুলনামূলক সস্তা হবে, এতে দেশীয় শিল্পের ওপর চাপ বাড়বে। বিশেষ করে নবীন ও সুরক্ষানির্ভর শিল্পগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খেতে পারে।

শ্রম ও পরিবেশ অধ্যায় বাস্তবায়নেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শ্রমিক অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়তে পারে। কৃষি ও খাদ্যপণ্য খাতে অতিরিক্ত মান ও স্যানিটারি শর্ত মানতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ কাজুয়াকি কাতাওকার মতে, শুল্কমুক্ত সুবিধা দামের দিক থেকে সহায়ক হলেও জাপানি ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে একটি ব্যবসাবান্ধব বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলাও জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১৪১ কোটি ডলার, বিপরীতে আমদানি ছিল ১৮৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি এখনো বিদ্যমান। ইপিএ এই ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে, যদি বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

সব মিলিয়ে জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাংলাদেশের জন্য একদিকে বড় সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, অন্যদিকে কঠিন প্রতিযোগিতা ও সংস্কারের চাপও তৈরি করেছে। দক্ষতা বৃদ্ধি, মান উন্নয়ন এবং নীতিগত প্রস্তুতি ছাড়া এই চুক্তির পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তবু দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বৈশ্বিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে—এমন আশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত