প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভিটামিন সি মানবদেহের জন্য একটি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান। এটি শুধু একটি সাধারণ ভিটামিন নয়; বরং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা থেকে শুরু করে ত্বক, হাড়, রক্তনালি ও কোষের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে শরীরকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের প্রভাব থেকে রক্ষা করে এবং নানা জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। চিকিৎসকদের মতে, ভিটামিন সি-কে শরীরের ‘পাওয়ার হাউস’ বলা হয়, কারণ এটি শক্তি উৎপাদন, কোষ মেরামত এবং সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক।
তবে আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাপন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ফল ও সবজি না খাওয়ার কারণে অনেকেই অজান্তেই ভিটামিন সি’র ঘাটতিতে ভুগছেন। শরীরে এই ভিটামিনের অভাব হলে ধীরে ধীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে, যেগুলো প্রথমে তেমন গুরুত্ব না পেলেও সময়ের সঙ্গে জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব লক্ষণকে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
ভিটামিন সি’র অভাবে সবচেয়ে সাধারণ ও স্পষ্ট যে লক্ষণটি দেখা যায়, তা হলো দাঁত ও মাড়ির সমস্যা। দাঁত ও মাড়ির সুস্থতার জন্য কোলাজেন অত্যন্ত জরুরি, আর এই কোলাজেন তৈরিতে ভিটামিন সি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। শরীরে ভিটামিন সি কমে গেলে কোলাজেনের গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মাড়ি ফুলে যাওয়া, মাড়ি থেকে রক্তপাত হওয়া কিংবা দাঁত ব্রাশ করার সময় অতিরিক্ত রক্ত পড়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এই ঘাটতি অব্যাহত থাকলে দাঁত ঢিলা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, এমনকি মারাত্মক ক্ষেত্রে দাঁত পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।
ভিটামিন সি’র ঘাটতির আরেকটি বড় লক্ষণ হলো দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও দুর্বলতা। অনেক সময় পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নেওয়ার পরও শরীরে শক্তি ফিরে আসে না। এর পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে ভিটামিন সি’র অভাব। এই ভিটামিন শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা করে। ফলে এর ঘাটতি হলে রক্তাল্পতার ঝুঁকি বাড়ে এবং দুর্বলতা, অবসাদ, কাজের প্রতি অনীহা ও সার্বক্ষণিক ক্লান্তিভাব দেখা দেয়। পাশাপাশি মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা, অল্পতেই বিরক্ত হওয়া কিংবা মানসিক অস্থিরতাও ভিটামিন সি’র অভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে।
অনেকেই জয়েন্টের ব্যথা বা হাড়ের সমস্যাকে বয়সজনিত বলে মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ভিটামিন সি’র অভাবও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। জয়েন্টের কার্টিলেজ মূলত কোলাজেন দিয়ে তৈরি। ভিটামিন সি কমে গেলে কোলাজেন উৎপাদন ব্যাহত হয়, ফলে হাড়ের চারপাশে প্রয়োজনীয় প্যাডিং কমে যায়। এর ফলে অল্প নড়াচড়াতেই জয়েন্টে ব্যথা, শক্তভাব বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জয়েন্ট ও হাড়ের চারপাশে প্রদাহ ও ফোলাভাবও দেখা যায়, যা দৈনন্দিন চলাফেরাকে কষ্টকর করে তোলে।
ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় রাখতেও ভিটামিন সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভিটামিন ত্বকের কোলাজেন উৎপাদন বাড়িয়ে ত্বককে টানটান, উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রাখতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি’র ঘাটতি হলে ত্বক শুষ্ক, রুক্ষ ও নিস্তেজ হয়ে ওঠে। ত্বকে অকালেই কুঁচকানো ভাব দেখা দিতে পারে এবং ত্বক তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারাতে শুরু করে। অনেক সময় ত্বকে ছোট ছোট দাগ বা রুক্ষতা দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভিটামিন সি’র অভাবে ক্ষত বা ঘা সহজে শুকাতে চায় না—এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। শরীরে কোনো কাটা-ছেঁড়া বা আঘাত লাগলে তা দ্রুত সেরে ওঠার জন্য কোলাজেনের প্রয়োজন হয়। ভিটামিন সি কোলাজেন উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হওয়ায় এর ঘাটতি হলে ক্ষত নিরাময়ের প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়ে। ফলে ছোটখাটো আঘাতও দীর্ঘদিন ধরে সেরে উঠতে দেরি করে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়াও ভিটামিন সি’র অভাবের একটি বড় লক্ষণ। ভিটামিন সি শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় ও শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে। এই ভিটামিনের অভাবে শরীর সহজেই ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের শিকার হয়। ফলে ঘন ঘন সর্দি-কাশি, জ্বর কিংবা অন্যান্য সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শরীরকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে।
চিকিৎসকরা আরও বলছেন, ভিটামিন সি’র অভাবে আকস্মিক ওজন বৃদ্ধি বা মেদ জমার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন সি শরীরের ফ্যাট মেটাবলিজমে ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি হলে শরীরের চর্বি পোড়ানোর ক্ষমতা কমে যায়, ফলে ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব লক্ষণ একসঙ্গে বা আলাদাভাবে দেখা দিতে পারে। তাই শরীরে দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, ত্বকের সমস্যা, ঘন ঘন অসুস্থতা কিংবা দাঁত-মাড়ির জটিলতা দেখা দিলে ভিটামিন সি’র ঘাটতির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবু, কমলা, পেয়ারা, আমলকি, টমেটো, কাঁচা মরিচ ও সবুজ শাকসবজি অন্তর্ভুক্ত করলে এই ঘাটতি সহজেই পূরণ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। তবে যেকোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া জরুরি। সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে ভিটামিন সি’র অভাবজনিত সমস্যা সহজেই এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।