প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের জন্য তথ্য জানার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও সময়সাশ্রয়ী করতে নতুন একটি ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকতেই ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ভোটাররা ঘরে বসেই তাদের ভোটকেন্দ্র ও বুথ সংক্রান্ত সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অ্যাপের মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের হয়রানি কমানো, বিভ্রান্তি দূর করা এবং ভোটাধিকার প্রয়োগকে আরও সহজ করা। জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে যে কোনো ভোটার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জানতে পারবেন তার নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রের নাম, নম্বর, ঠিকানা ও অবস্থান।
‘Smart Election Management BD’ নামের এই অ্যাপটি ইতোমধ্যে গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী যে কোনো ভোটার বিনা খরচে অ্যাপটি ডাউনলোড করে প্রয়োজনীয় তথ্য নিতে পারছেন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই অ্যাপের একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো ভোটকেন্দ্রের জিও লোকেশন সংযুক্ত করা। ফলে ভোটাররা শুধু কেন্দ্রের নাম জানাই নয়, বরং ম্যাপের মাধ্যমে সরাসরি দেখতে পারবেন কেন্দ্রটি কোথায় অবস্থিত। নিজের বর্তমান অবস্থান থেকে ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব কত, কীভাবে সেখানে পৌঁছাতে হবে—এসব তথ্যও অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাবে। এতে করে ভোটের দিন ভোটকেন্দ্র খুঁজে পেতে আর কাউকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না।
অ্যাপটিতে ভোটকেন্দ্রের ভবনের ছবিও সংযুক্ত করা হয়েছে, যা বিশেষ করে বড় শহরের ভোটারদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করবে। অনেক সময় একই এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ভবন থাকায় ভোটাররা বিভ্রান্তিতে পড়েন। ভবনের ছবি থাকায় ভোটকেন্দ্র শনাক্ত করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু ভোটকেন্দ্রের তথ্য নয়, এই অ্যাপে আরও নানা ধরনের নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর পরিচিতি, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামা, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন নির্দেশনা এবং নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফল সম্পর্কিত তথ্যও এই অ্যাপে পাওয়া যাবে। এতে ভোটাররা একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই নির্বাচন সম্পর্কে সমন্বিত ধারণা নিতে পারবেন।
অ্যাপটি ব্যবহার করতে হলে প্রথমে মোবাইল ফোনে ইনস্টল করে নিতে হবে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও জন্মতারিখ প্রদান করলে ভোটারের প্রয়োজনীয় সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে ভোটার আইডি নম্বর, নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রের নাম ও ঠিকানা, ভোট দেওয়ার বুথ বা কক্ষ নম্বর এবং ভোটারের ক্রমিক নম্বর। এই তথ্যগুলো সাধারণত ভোটার স্লিপে পাওয়া যায়, তবে অনেক ভোটার ভোটের দিন এসব তথ্য না থাকায় বিড়ম্বনায় পড়েন। নতুন অ্যাপটি সেই সমস্যার কার্যকর সমাধান দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে মহানগর ও বড় শহরগুলোর ভোটারদের জন্য এই উদ্যোগটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় সাধারণত ভোটাররা তাদের ভোটকেন্দ্র সম্পর্কে আগেই ধারণা রাখেন। কিন্তু শহরাঞ্চলে সংসদ নির্বাচনের সময় অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কেন্দ্র পরিবর্তন করা হয়। ফলে একই এলাকার ভোটারদের ভোটকেন্দ্র আলাদা আলাদা স্থানে নির্ধারিত হয়, যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া নতুন ভোটারদের জন্য ভোটকেন্দ্র খুঁজে পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক নতুন ভোটার জানেন না তাদের ভোটার নম্বর বা ক্রমিক নম্বর কত। আবার কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রের নাম জানলেও সঠিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত থাকেন না। ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপ এসব সমস্যার সমাধানে একটি কার্যকর ডিজিটাল সহায়ক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে তথ্যের সহজলভ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্র খুঁজে না পেয়ে বা তথ্যের অভাবে কেউ যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত না থাকেন, সেজন্যই এই অ্যাপ চালু করা হয়েছে। এতে করে ভোটের দিন ভোটারদের চাপ কমবে এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল হবে বলে তারা মনে করছেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভোটসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার এই উদ্যোগ নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও আধুনিকতার দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ভোটারদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় আরও উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে। নির্বাচন কমিশন ভোটারদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপ চালুর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন ভোটারবান্ধব একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় ভোটকেন্দ্র ও বুথের তথ্য সহজলভ্য হওয়ায় ভোটারদের ভোগান্তি কমবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ আরও উৎসাহিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।