প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঘরের মাঠে চলমান ক্রিকেট বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে শুভসূচনা করেছে ভারত। জয় পেলেও মাঠের বাইরের এক সিদ্ধান্ত ভারতের ক্রিকেটারদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে বড় ধাক্কা হিসেবে ধরা দিয়েছে। জানা গেছে, টুর্নামেন্ট চলাকালীন ভারতীয় ক্রিকেটাররা তাদের স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকার অনুমতি পাননি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের পরিবার সরাসরি দলের সঙ্গে সফর করবে না।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সঙ্গে আলাপকালে বিসিসিআইয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, “ভারতীয় দলের ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের কাছে জানতে চেয়েছিল, খেলোয়াড়দের স্ত্রী বা বাগদত্তারা দলের সঙ্গে ভ্রমণ করতে পারবে কি না। বিসিসিআই স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, পরিবার থাকবে না। তবে চাইলে তারা আলাদা ব্যবস্থায় থাকতে পারবে।”
বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিবার রাখার বিষয়ে এই নীতি নতুন নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির সফরের পর ভারতীয় দলের বড় পরাজয়ের পর বিসিসিআই নতুন নির্দেশনা চালু করে। সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশ সফরের মেয়াদ যদি ৪৫ দিনের বেশি হয়, খেলোয়াড়রা সর্বোচ্চ ১৪ দিনের জন্য পরিবারসহ থাকতে পারবেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পুরো সফরজুড়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিবার থাকার অনুমতি থাকলেও, গত বছরের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর এই নীতি আরও কঠোর করা হয়।
পরিবারের সান্নিধ্য না থাকাকে কিছুটা কমানোর জন্য পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ভারতীয় দল ব্যক্তিগত চার্টার্ড বিমানে যাতায়াত করবে। পাশাপাশি কয়েকজন খেলোয়াড়ের জন্য ব্যক্তিগত রাঁধুনি রাখা হয়েছে। তারা আলাদা বা কাছাকাছি হোটেলে থাকবেন এবং খাবার দলকে পৌঁছে দেওয়া হবে। এই ব্যবস্থা বিসিসিআইয়ের ‘শুধু কাজ, কোনো আবেগ নয়’ নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বড় ম্যাচগুলোতে হতাশাজনক ফলাফলের পর বোর্ড শৃঙ্খলা এবং মনোসংযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। খেলোয়াড়দের চারপাশের পরিবেশ এমনকি খাদ্যাভ্যাসও নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। আরামের চেয়ে নিয়মানুবর্তিতাকেই প্রাধান্য দিয়ে বিসিসিআই চাইছে খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকুক।
তবে প্রশ্নটি আসছে—এই কঠোর পরিবেশ খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে দৃঢ় করবে নাকি দীর্ঘ সময় ‘বাবল’-এ থাকার চাপ তাদের ক্লান্ত করে তুলবে? এই উত্তরই নির্ধারণ করবে ভারতের বিশ্বকাপের ভাগ্য।
ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব প্রথম ম্যাচে দাপুটে পারফরম্যান্সে দলকে জয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু দলীয় ব্যাটিং বিপর্যয়ের সময়ে তার নেতৃত্বই মূল অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। মাঠের জয়ে স্বস্তি থাকলেও, ব্যক্তিগত জীবনে পরিবারের সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকার বিষয়টি খেলোয়াড়দের উপর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মানসিক স্থিতিশীলতা মাঠের পারফরম্যান্সে সরাসরি প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময়ের ‘বাবল’ এবং পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা খেলোয়াড়দের মনোযোগ, মানসিক চাপ সামলানো ও পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বিসিসিআই নিশ্চিত করেছে, খাদ্য ও অন্যান্য সুবিধার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই কঠোর ব্যবস্থা বোঝায় যে বোর্ড খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত আরামকে প্রাধান্য না দিয়ে পুরো দলের জন্য শৃঙ্খলা, একনিষ্ঠতা এবং মনোসংযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ধরনের মনোযোগ ও নিয়মানুবর্তিতা বড় টুর্নামেন্টে জয়ী হওয়ায় সাহায্য করতে পারে। তবে দীর্ঘ সময়ের মানসিক চাপ দলকে ক্লান্ত করতে পারে, যা বিশ্বকাপের শিরোপার প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, খেলোয়াড়দের পারিবারিক সান্নিধ্য না থাকা মানসিকভাবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে একইসঙ্গে তারা বলছেন, দলীয় শৃঙ্খলা, খেলোয়াড়দের নিরাপদ পরিবেশ, খাদ্য ও আবাসন নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে বোর্ড তাদের প্রাপ্তি ও সক্ষমতা সর্বোচ্চ করতে চাচ্ছে। এই দ্বৈত চাপ—কঠোর শৃঙ্খলা বনাম পারিবারিক দূরত্ব—দলকে মানসিকভাবে পরীক্ষা করবে।
বিশ্বকাপের মতো বড় পর্যায়ে যেকোনো ছোট বিষয়ও দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মানসিক চাপ, পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, দীর্ঘ সফর এবং প্রতিদিনের নিয়ন্ত্রণ—all এসব মিলিত হয়ে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি ও ফোকাসে প্রভাব ফেলে। বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত অবশ্য কৌশলগত—কারণ খেলোয়াড়দের একঘরে, নিয়ন্ত্রণে রাখা দলকে মানসিকভাবে একরূপ রাখার চেষ্টা।
ভারতীয় ক্রিকেট ভক্তদের জন্য বিষয়টি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জয় বা হার শুধু মাঠের বিষয় নয়, মানসিক প্রস্তুতি এবং টুর্নামেন্ট চলাকালীন দলীয় অভ্যন্তরীণ পরিবেশও বড় ভূমিকা রাখে। এমন পরিস্থিতিতে বোর্ডের কঠোর নীতি কি দলকে শিরোপার দিকে এগোতে সাহায্য করবে নাকি খেলোয়াড়দের ক্লান্তি ও চাপ আরও বাড়াবে, তা বিশ্বকাপের পর চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।