প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান আরও নিম্নমুখী হয়েছে। ১০০ পয়েন্টের স্কেলে বাংলাদেশ ২৪ পয়েন্ট অর্জন করেছে এবং বিশ্বের নিচের দিক থেকে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। যদিও স্কোরের মান এক পয়েন্ট বেড়েছে, তবু বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে দেশের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিষয়টি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মঙ্গলবার প্রকাশিত সংবাদ সম্মেলনে জানান।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটি মূলত একটি হারানো সুযোগের চিত্র। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে কিছু ইতিবাচক প্রক্রিয়া দেখা গেছে, যেমন চোরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হওয়া। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রক্রিয়া, মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনের ঘাটতি দেশের সামগ্রিক অবস্থান নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।’
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩২ দেশের মধ্যে চতুর্থ সর্বনিম্ন অবস্থান গ্রহণ করেছে। বৈশ্বিকভাবে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫০তম অবস্থান বাংলাদেশের ‘দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ হারানো দেশগুলোর’ কাতারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দৃষ্টান্ত স্থাপনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ, দলবাজি এবং স্বচ্ছতার অভাব সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ করেছে।’
টিআইবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশের গড় স্কোর ছিল ২৬। ২০২৫ সালে স্কোর নেমে এসেছে ২৪-এ, যা গড়ের তুলনায় দুই পয়েন্ট কম এবং ২০১৭ সালে অর্জিত সর্বোচ্চ ২৮ স্কোরের তুলনায় চার পয়েন্ট কম। গত দশ বছরে দেশের অবস্থান দুই পয়েন্ট খরচ করেছে। বৈশ্বিক গড় স্কোর যেখানে ৪২, সেখানে বাংলাদেশের স্কোর ১৮ পয়েন্ট কম। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় ৪৫, যেখানে বাংলাদেশ ২১ পয়েন্ট পিছিয়ে। এমনকি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার দেশগুলোর গড় স্কোরের তুলনায়ও বাংলাদেশ পাঁচ পয়েন্ট কম এবং ‘বন্ধ সিভিক স্পেস’ থাকা দেশগুলোর চেয়ে ছয় পয়েন্ট নিচে অবস্থান করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে স্বাধীন ও কার্যকর করার সুপারিশ কার্যকর হয়নি। উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের প্রতিশ্রুতিও এখনও পূরণ হয়নি। বরং দুদকের অকার্যকরতা রক্ষার মতো অর্ডিন্যান্স জারি হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা, নেপাল, লাওস এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থা ও কঠোর বিচারিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি দেখিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। শ্রীলঙ্কা এবার তিন পয়েন্ট বেশি স্কোর করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্নীতি কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অপরাধীদের প্রতি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাংলাদেশেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান পরবর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, দুদককে স্বাধীন করা, সম্পদ বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, অর্থ পাচার রোধে আইন সংস্কার, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যম ও সিভিক স্পেসের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে সুশাসনের ভিত্তি মজবুত করতে হবে। তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ নেয়া না হলে দেশ শুধু আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনমানের দিক থেকেও পিছিয়ে যাবে।
দুর্নীতির সূচকে অবনমনের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামোর অভাবের কারণে দেশটি আজও দুর্নীতির গর্তে আটকে রয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেন, যদি দমনমূলক পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়ন লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারে।
এই রিপোর্টের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের অভাব কেবল সরকারি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জনগণের দৈনন্দিন জীবনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায্য অর্থ বিতরণ, ব্যবসা ও বিনিয়োগ—all ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রভাব স্পষ্ট। তাই আগামী নির্বাচিত সরকারকে এই প্রেক্ষাপটকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সকল স্তরে জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে।