প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত যৌন অপরাধী ও অর্থ বিনিয়োগকারী জেফরি এপস্টিনের মৃত্যু রহস্য, তাঁর অপরাধ নেটওয়ার্ক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যেমন দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে, তেমনি তাঁর বিপুল সম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আগ্রহ ও প্রশ্ন কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টিন–সংক্রান্ত লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করার পর নতুন করে সামনে এসেছে তাঁর কোটি কোটি ডলারের সম্পদের উত্তরাধিকার প্রশ্ন। কে পাচ্ছেন এই অর্থ, কীভাবে ভাগ হচ্ছে এপস্টিনের রেখে যাওয়া সম্পদ, আর ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ সেখানে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মৃত্যুর আগে জেফরি এপস্টিনের মোট সম্পদের আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ৬০ কোটি ডলার। নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, নিউ মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন দেশে তাঁর মালিকানাধীন ছিল বিলাসবহুল বাড়ি, দ্বীপ, বিনিয়োগ তহবিল ও বিপুল নগদ অর্থ। তবে ২০১৯ সালের আগস্টে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই এই সম্পদ নিয়ে শুরু হয় আইনি লড়াই, ক্ষতিপূরণ দাবি ও কর সংক্রান্ত জটিলতা। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, এই বিপুল সম্পদের বড় অংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে উঠে এসেছে কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, এপস্টিন মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে একটি আইনি দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা পরিচিত ‘১৯৫৩ ট্রাস্ট’ নামে। এপস্টিনের জন্মসালের সঙ্গে মিল রেখে এই ট্রাস্টের নামকরণ করা হয়। এতদিন গোপন থাকা এই ৩২ পৃষ্ঠার দলিলেই মূলত নির্ধারিত হয়েছে তাঁর সম্পদের ভবিষ্যৎ। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে এপস্টিন তাঁর তৎকালীন প্রেমিকা কারিনা শুলিয়াককে নিজের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে মনোনীত করেন।
নথিতে এপস্টিন উল্লেখ করেছিলেন, তিনি কারিনা শুলিয়াককে বিয়ে করার কথা ভাবছিলেন। সেই বিবেচনাতেই তাঁর জীবদ্দশার শেষ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলিলে সই করার পর থেকেই শুলিয়াক আইনগতভাবে এপস্টিনের বিশাল সম্পদের একটি বড় অংশের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠেন। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাস্ট থেকে তিনি প্রায় ১০ কোটি ডলার সমমূল্যের সম্পদ পেতে পারেন। এর মধ্যে তাঁর জন্য নির্ধারিত রয়েছে প্রায় ৫ কোটি ডলারের একটি বার্ষিক বৃত্তি বা ফান্ড, যা দীর্ঘমেয়াদে তাঁকে আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে।
শুধু নগদ অর্থ নয়, এপস্টিনের স্থাবর সম্পত্তির একটি বড় অংশও শুলিয়াকের নামে বরাদ্দ থাকার কথা নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, এপস্টিনের মালিকানাধীন বহু বাড়ি ও সম্পত্তি এরই মধ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এসব বিক্রির অর্থ ট্রাস্টের আওতায় এসেছে, যা থেকে আইনজীবীদের ফি, কর এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে শুলিয়াক শেষ পর্যন্ত ঠিক কতটা সম্পদ হাতে পাবেন, তা এখনো চূড়ান্ত নয়।
‘১৯৫৩ ট্রাস্ট’-এর নথিতে শুধু কারিনা শুলিয়াক নন, আরও অন্তত ৪০ জন সম্ভাব্য সুবিধাভোগীর নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে সবাই যে সমান অংশ পাবেন, এমন নয়। বরং কারা কতটা পাবেন, তা নির্ভর করছে আইনি নিষ্পত্তি, পাওনাদারদের দাবি এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন এপস্টিনের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত আইনজীবী ড্যারেন ইনডাইক এবং তাঁর নিজস্ব হিসাবরক্ষক রিচার্ড কান। এই দুজনই ট্রাস্টের সহনিষ্পত্তিকারী বা কো-এক্সিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নথি অনুযায়ী, ড্যারেন ইনডাইককে প্রায় ৫ কোটি ডলার এবং রিচার্ড কানকে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তবে এপস্টিনের সম্পত্তির আইনজীবী ড্যানিয়েল ওয়েইনার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ঋণদাতা, কর কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য দাবিদারের পাওনা সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ট্রাস্টের কোনো সুবিধাভোগীই চূড়ান্তভাবে অর্থ হাতে পাবেন না। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর একটি হলো এপস্টিনের হাতে নির্যাতিত নারীদের ক্ষতিপূরণ।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এপস্টিনের মৃত্যুর পর তাঁর বিরুদ্ধে আনা বহু অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা হয়। এই তহবিল থেকেই বহু নারী আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এসব পরিশোধ, দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং কর সংক্রান্ত ব্যয়ের ফলে এপস্টিনের সম্পদের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। যেখানে একসময় এই সম্পদের মূল্য ছিল প্রায় ৬০ কোটি ডলার, সাম্প্রতিক আদালত নথি অনুযায়ী বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ১২ কোটি ডলারে।
এপস্টিনের ব্যক্তিগত জীবনের আরেকটি আলোচিত চরিত্র কারিনা শুলিয়াক সম্পর্কে প্রকাশিত নথিতে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। বেলারুশের নাগরিক শুলিয়াক ২০১২ সাল থেকে এপস্টিনকে চিনতেন। জানা গেছে, এপস্টিন তাঁর ডেন্টাল স্কুলে পড়াশোনার খরচ বহন করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত শুলিয়াক বর্তমানে নিউইয়র্ক শহরেই থাকেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে অতীতে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে না এলেও নতুন নথিতে তাঁর নাম বারবার উঠে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এপস্টিনের সম্পদের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের তালিকায় আরও যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল, যিনি ইতিমধ্যে যৌন পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধে দণ্ডিত। এ ছাড়া এপস্টিনের ভাই মার্ক এপস্টিন, হার্ভার্ডের অধ্যাপক মার্টিন নোওয়াকসহ আরও কয়েকজনের নাম নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে সম্পদের অংশীদারিত্বের পরিমাণ ও শর্ত আলাদা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, জেফরি এপস্টিনের রেখে যাওয়া সম্পদ শুধু আর্থিক বিষয় নয়, বরং নৈতিকতা, বিচার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায্যতার প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত নথি ও ট্রাস্ট সংক্রান্ত তথ্য একদিকে যেমন ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের অন্ধকার সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে তেমনি দেখায়, আইনি প্রক্রিয়া ও ক্ষতিপূরণের ভারে কীভাবে একটি বিশাল সম্পদ ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত এপস্টিনের কোটি কোটি ডলারের সম্পদ কার হাতে কতটা যাবে, তা নির্ধারিত হবে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেই। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই সম্পদের ইতিহাস এপস্টিন কেলেঙ্কারির মতোই বিতর্ক, প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিতে থাকবে।