প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা–১১ এখন রীতিমতো রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। রামপুরা, বাড্ডা, ভাটারা ও হাতিরঝিলের আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখেরও বেশি। নগরজীবনের নানা সংকট, যানজট, জলাবদ্ধতা, বাসস্থান, নিরাপত্তা ও নাগরিক সেবার প্রশ্নে বরাবরই আলোচিত এই আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১০ জন প্রার্থী। তাঁদের কেউ ব্যানার–ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে এলাকা ছেয়ে ফেলেছেন, কেউ আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটে মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করছেন।
এই ভিন্ন পথের প্রতীক হয়ে উঠেছেন ঢাকা–১১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার। ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই প্রার্থী আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী। তাঁর প্রচারণা চোখে পড়ার মতো নয় ব্যানার–ফেস্টুনে, নেই বড় কোনো মিছিল বা শোডাউন। তবু তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের মন জয় করতে পারলে পোস্টার বা ব্যানারের দরকার হয় না। তাঁর মতে, ব্যানার বা মিছিল নয়, মানুষের কাছে যাওয়া এবং তাদের কথা শোনাই আসল রাজনীতি।
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যেখানে বিএনপি, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের ব্যানার–ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে এলাকাজুড়ে এক ধরনের নির্বাচনী দৃশ্যমানতা তৈরি হয়েছে, সেখানে ফুটবল প্রতীকের কোনো দৃশ্যমান প্রচার চোখে পড়ে না। এ প্রসঙ্গে কহিনূর আক্তার বলেন, তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সীমিত পরিসরে প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁর বিশ্বাস, ‘আপনি ভালো হলে মানুষ আপনাকে খুঁজে বের করবে। আমি যেখানে যাচ্ছি, মানুষ নিজেরাই লিফলেট নিয়ে যাচ্ছে। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সাড়া। কহিনূর আক্তার জানান, পথে–ঘাটে অনেকেই তাঁকে দোয়া করে বলেন, ইনশা আল্লাহ তিনি কামিয়াব হবেন। আবার দু–একজন ব্যঙ্গও করেন। এসব প্রতিক্রিয়া তিনি গায়ে মাখেন না বলেই জানান। তাঁর ভাষায়, মানুষের ভালোবাসা আর বিশ্বাসই তাঁর রাজনীতির শক্তি।
ঢাকা–১১ আসনের রাজনৈতিক মাঠে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এম এ কাইয়ুম। দীর্ঘদিনের বড় দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি, কর্মী–সমর্থকদের সক্রিয়তা এবং ব্যাপক পোস্টার–ব্যানার ও বিলবোর্ড প্রচারে তাঁকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। তাঁর পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম শাপলা কলি প্রতীকে নির্বাচনে নেমেছেন। তরুণ নেতৃত্ব ও পরিবর্তনের স্লোগান নিয়ে তাঁর প্রচারণাও বেশ দৃশ্যমান।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শেখ ফজলে বারী মাসউদ হাতপাখা প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। ঢাকা–১১ আসনের বিভিন্ন এলাকায় এই তিন প্রার্থীর ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড চোখে পড়ে সবচেয়ে বেশি। নগরীর ব্যস্ত সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকাজুড়ে এসব প্রচার সামগ্রী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে তুলেছে।
অন্যদিকে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আরিফুর রহমান। ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এই প্রার্থী বলেন, তাঁর কাছে জয়–পরাজয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছানো। তিনি মনে করেন, মানুষ পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বাইরে এসে পরিবর্তন চায়। তাঁর প্রচারণায় বড় কোনো আয়োজন না থাকলেও মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে তিনি সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন।
গণফোরামের প্রার্থী মো. আবদুল কাদের উদীয়মান সূর্য প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি স্বীকার করেন, ব্যানার–বিলবোর্ডের সংখ্যা কম এবং অবৈধ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় প্রচারণায় অন্যদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছেন। তবু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি। ভোটারদের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পেলেও জয়ের বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না এই প্রার্থী।
এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির শামীম আহমেদ লাঙ্গল প্রতীকে, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. জাকির হোসেন হাতি প্রতীকে এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মিজানুর রহমান আম প্রতীকে। নানা রাজনৈতিক মতাদর্শ ও প্রতীকের উপস্থিতিতে ঢাকা–১১ আসনের নির্বাচন হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা–১১ আসনের লড়াই কেবল ব্যানার–ফেস্টুনের নয়, বরং রাজনীতির দর্শন ও পদ্ধতিরও লড়াই। একদিকে রয়েছে বড় দলের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও দৃশ্যমান প্রচারণা, অন্যদিকে রয়েছে সীমিত সামর্থ্যের প্রার্থীদের মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর প্রচেষ্টা। কহিনূর আক্তারের মতো প্রার্থীরা এই আসনে রাজনীতির এক ভিন্ন বার্তা দিচ্ছেন—যেখানে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, বিশ্বাস ও সততার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
নগরবাসীর দৈনন্দিন সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা–১১ আসনের ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবেন, তা নির্ভর করবে তাঁদের প্রত্যাশা ও আস্থার ওপর। পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ডের ঝলকানি নাকি মানুষের মন জয়ের নীরব প্রচেষ্টা—কোনটি ভোটারদের সিদ্ধান্তে বেশি প্রভাব ফেলবে, সেই উত্তর মিলবে ভোটের দিন। তবে এটুকু নিশ্চিত, ঢাকা–১১ আসনের এই নির্বাচন রাজধানীর রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে যাবে।