সমঝোতা না হলে কঠিন পথে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৮ বার
যুক্তরাষ্ট্র ইরান সমঝোতা সংকট

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মঙ্গলবার ইসরাইলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পথেই সমাধান চায়, তবে চুক্তি না হলে “গতবারের মতো খুব কঠিন কিছু” করার বিকল্পও তাদের সামনে খোলা রয়েছে।

তার এই মন্তব্যকে কূটনৈতিক ভাষায় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, এটি একদিকে যেমন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টা। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনা হতে পারে। এই সম্ভাব্য বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হলেও একই সঙ্গে অনিশ্চয়তাও বাড়ছে, কারণ দুই দেশের অবস্থান এখনো বেশ দূরত্বে অবস্থান করছে।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, এবারের আলোচনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন এবং তার ভাষায় ইরান অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে চুক্তি করতে চায়। তবে তেহরান এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়। ইরানের কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, তারা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত, কিন্তু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তারা কোনো অবস্থাতেই ছাড়বে না। ইরান এটিকে তাদের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে দেখে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও এই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক বহু দশক ধরেই বৈরিতায় পূর্ণ। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা আরোপ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে উত্তপ্ত করে তোলে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে, যার লক্ষ্য তেহরানকে নতুন শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা। সাম্প্রতিক বক্তব্যে ট্রাম্প সেই কৌশলই পুনর্ব্যক্ত করেছেন বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদারের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, অঞ্চলটিতে একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর পাশাপাশি আরেকটি রণতরী মোতায়েনের পরিকল্পনাও বিবেচনাধীন রয়েছে। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, একটি নৌবহর ইতোমধ্যে সেখানে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও একটি পাঠানো হতে পারে। এই ঘোষণা কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি প্রায়ই উত্তেজনা প্রশমনের বদলে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি বলেছেন, তিনি আশা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শিগগিরই পুনরায় শুরু হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি তেহরানের “রেড লাইন” বা আপসহীন অবস্থানগুলো পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সতর্ক করে দেন যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো হামলা চালালে তার জবাব কঠোর হবে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো প্রবল।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক জটিল ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যেখানে একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার দরজা খোলা, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতির সংকেতও স্পষ্ট। এই দ্বৈত কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন নয়; প্রায়ই বড় শক্তিগুলো আলোচনার চাপ বাড়াতে শক্তির প্রদর্শন করে থাকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এমন কৌশল পরিস্থিতিকে দ্রুত অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই উত্তেজনা গভীর উদ্বেগের কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে, তবে তার প্রভাব শুধু এই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি দিক রয়েছে। এটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। শক্ত অবস্থান প্রদর্শন অনেক সময় নেতাদের জন্য জনপ্রিয়তা বাড়ানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে আসে। ফলে তার বক্তব্যকে কেবল কূটনৈতিক সতর্কতা নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ এখনো আশা করছে যে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পথই প্রাধান্য পাবে। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, সরাসরি সংঘর্ষের তুলনায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে এবং আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে সম্ভাব্য আলোচনার প্রস্তুতি, অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রদর্শন—এই দ্বৈত বাস্তবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিচিত দৃশ্য হলেও এর পরিণতি কী হবে তা এখনো অনিশ্চিত। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি এবং ইরানের পাল্টা সতর্কবার্তা মিলিয়ে স্পষ্ট যে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে দৃঢ়, কিন্তু একই সঙ্গে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।

বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ এই সংকটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা আলোচনা সফল হলে উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার পথ খুলতে পারে, আর ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি দ্রুত কঠোর দিকে মোড় নিতে পারে। তাই এখন সবার নজর কূটনৈতিক অঙ্গনে, যেখানে সিদ্ধান্ত হবে সংঘাত নাকি সমঝোতা—কোন পথে এগোবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্পর্ক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত