নাইজেরিয়ায় ২০০ সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১ বার
নাইজেরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সেনা মোতায়েন

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পশ্চিম আফ্রিকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে। মার্কিন আফ্রিকা কমান্ড জানিয়েছে, নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা দিতে প্রায় ২০০ সেনা সদস্য দেশটিতে মোতায়েন করা হবে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম এবং ইসলামিক স্টেট সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে নাইজেরিয়ার সেনাদের সক্ষমতা বাড়ানো। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই বাহিনী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না; বরং প্রশিক্ষণ, কৌশলগত সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান করবে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাইজেরিয়ায় আগে থেকেই অবস্থানরত একটি ছোট মার্কিন সামরিক দলের সঙ্গে সমন্বয় করেই নতুন দলটি কাজ করবে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই সেনারা সেখানে পৌঁছাবে। মার্কিন আফ্রিকা কমান্ডের এক মুখপাত্র আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নাইজেরিয়ার সেনাদের বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের সমন্বয় কৌশল উন্নত করতেও তারা সহায়তা করবে। এই সহযোগিতাকে ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নিরাপত্তা সহযোগিতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

নাইজেরিয়ার প্রতিরক্ষা সদর দপ্তরের মুখপাত্র সামাইলা উবা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মার্কিন সেনারা কোনো সরাসরি যুদ্ধ বা অভিযান পরিচালনা করবে না। তিনি বলেন, তাদের ভূমিকা মূলত পরামর্শক ও প্রশিক্ষকের, যাতে নাইজেরিয়ার বাহিনী নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আধুনিক কৌশল প্রয়োগ করতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নাইজেরিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র বিদ্রোহ, অপহরণ, গ্রাম আক্রমণ এবং ধর্মীয় সহিংসতার মতো জটিল নিরাপত্তা সংকটে ভুগছে।

বোকো হারাম এবং ইসলামিক স্টেট পশ্চিম আফ্রিকা প্রদেশ নামে পরিচিত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সহিংসতা চালিয়ে আসছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বহু গ্রামবাসী নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার সতর্ক করে বলেছে, যদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো না হয় তবে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্নে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপের মুখেও রয়েছে নাইজেরিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, দেশটিতে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে নির্যাতন চলছে। এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে ধর্মীয় সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে এসেছে। যদিও নাইজেরিয়ার সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, সহিংসতার শিকার শুধু কোনো একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়; মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই জঙ্গি হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের আরব ও আফ্রিকান বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা মাসাদ বোলোস গত বছর মন্তব্য করেছিলেন, বোকো হারাম ও ইসলামিক স্টেটের হামলায় বাস্তবে খ্রিস্টানদের চেয়ে বেশি মুসলিম নিহত হচ্ছে। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করে এবং বিষয়টি স্পষ্ট করে যে নাইজেরিয়ার সংকটটি একক কোনো ধর্মীয় দ্বন্দ্ব নয়; বরং এটি জটিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের সমন্বিত রূপ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্বল প্রশাসন এবং সীমান্ত নিরাপত্তাহীনতা জঙ্গিবাদের বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সামরিক সহায়তা পরিকল্পনা অনেকের কাছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও সমালোচনারও মুখে পড়েছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, বিদেশি সামরিক উপস্থিতি কখনো কখনো স্থানীয় জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। আবার অন্যদের মতে, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া নাইজেরিয়ার পক্ষে জঙ্গি নেটওয়ার্ক মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এই সহায়তা যদি স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হতে পারে।

আফ্রিকা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দিয়ে আসছে, বিশেষ করে যেখানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের ঝুঁকি বেশি। নাইজেরিয়াকে আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখা হয়, কারণ দেশটি জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক প্রভাবের দিক থেকে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে পুরো পশ্চিম আফ্রিকা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মানবাধিকার কর্মীরা আশা করছেন, সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, মানবাধিকার মানদণ্ড এবং জবাবদিহিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। কারণ অতীতে নিরাপত্তা অভিযানের সময় সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তা যদি এই দিকগুলোতে উন্নয়ন ঘটাতে পারে, তবে তা নাইজেরিয়ার জনগণের আস্থা বাড়াবে এবং জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সরকারের প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হবে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় তা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সফলতা, স্থানীয় বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট যে নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে এবং বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত