প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি নতুন কৌশলগত সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহে ভারতের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে নতুন এই চুক্তির ফলে সেই প্রভাবের কাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য শুল্কে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত একটি নতুন প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেতে যাচ্ছে।
এই চুক্তিকে বিশ্লেষকরা শুধু একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়, বরং সরবরাহ শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এতদিন বাংলাদেশের বহু টেক্সটাইল মিল ভারতীয় তুলার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক কম পরিবহন ব্যয় এবং সহজ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে এই নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের রপ্তানি নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, কোটা আরোপ এবং হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা জারির মতো সিদ্ধান্ত শিল্প উদ্যোক্তাদের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছিল। ফলে মিল মালিকরা বিকল্প উৎস খোঁজার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। নতুন চুক্তি সেই বিকল্প পথকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পারস্পরিক বাণিজ্য সুবিধা বাড়াতে নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি পোশাক আবার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে তাতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে না। এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা সরাসরি মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহার করে একই বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একটি ‘সাপ্লাই চেইন অ্যালাইনমেন্ট’ মডেল, যেখানে উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে সরাসরি সমন্বয় তৈরি হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের তুলা আমদানিতে ভারতের অংশ ছিল ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা তখন দেশটিকে শীর্ষ সরবরাহকারীর অবস্থানে রেখেছিল। কিন্তু ধারাবাহিক নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বাজারগত পরিবর্তনের কারণে ২০২৫ সালে সেই অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে ভারত থেকে তুলা আমদানি ২১ শতাংশের বেশি কমেছে। এই পরিসংখ্যান শিল্পখাতে সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যের প্রবণতা স্পষ্ট করে, যা নতুন চুক্তির প্রেক্ষাপটে আরও দ্রুততর হতে পারে।
এদিকে ব্রাজিল ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তুলা বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্রাজিল মোট আমদানির প্রায় ২৭ শতাংশ সরবরাহ করে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াও ধীরে ধীরে তাদের অংশ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে মোট তুলা আমদানির প্রায় এক-দশমাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে এবং নতুন চুক্তির ফলে এই অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে, যার মধ্যে নিট পণ্যের অংশ প্রায় ৫৫ শতাংশ। এই বিশাল শিল্পখাত মূলত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, ফলে তুলা ও সুতা সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্য সরাসরি উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে মানসম্মত কাঁচামাল স্থিতিশীলভাবে পাওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের প্রস্তুত পোশাক শিল্প দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল ভিত্তি পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিল্প উদ্যোক্তাদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের নীতিগত অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে ভারতীয় তুলা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হওয়ায় সেটিই প্রধান উৎস ছিল, কিন্তু নীতিগত পরিবর্তন এবং দামের অস্থিরতা ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চয়তার সুযোগ দেখতে পাচ্ছেন। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা আরও সুসংগঠিত হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ডেলিভারি সময়সীমা বজায় রাখা সহজ হবে।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ সতর্ক করে বলেছেন, নতুন বাণিজ্য চুক্তি যতটা সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, ততটাই কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন তৈরি করেছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারত এখনো একটি বড় বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে গিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখতে হবে। তাদের মতে, আঞ্চলিক অর্থনীতি এখন পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে, তাই প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে টেকসই কৌশল।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই চুক্তি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলা সংকট, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বহু দেশই একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও সেই ধারার অংশ হয়ে বহুমুখী উৎস নিশ্চিত করার পথে হাঁটছে। এর ফলে শুধু কাঁচামাল সরবরাহ নয়, বরং প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থনীতিবিদদের ধারণা, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি কেবল স্বল্পমেয়াদি সুবিধা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে শিল্প কাঠামো, বাণিজ্য নীতি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এই চুক্তির সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে নীতিগত স্বচ্ছতা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং শিল্পখাতের অভিযোজন ক্ষমতার ওপর। তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট যে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের দ্রুত পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।