ইউনূসের সম্পদ ১৫ কোটি ছাড়াল, প্রকাশ তালিকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১১ বার
ড ইউনূস সম্পদের হিসাব

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সম্পদের সর্বশেষ ঘোষণায় দেখা গেছে, গত এক বছরে তার মোট পরিসম্পদ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, যা ২০২৫ সালের ৩০ জুন শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪ হাজার টাকা। সরকারি ভাষ্যে বলা হয়েছে, সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, ব্যাংক আমানত বৃদ্ধি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শেয়ারসহ বিভিন্ন আর্থিক উৎস থেকে এই বৃদ্ধি ঘটেছে।

সরকারি নথিতে পরিসম্পদ বলতে একজন করদাতার মালিকানাধীন সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, আর্থিক বিনিয়োগ, নগদ অর্থ এবং অন্যান্য মূলধনী সম্পদের সম্মিলিত হিসাবকে বোঝানো হয়। সেই হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার সম্পদ বৃদ্ধির বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার আর্থিক সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে ১৪ কোটি ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৩ কোটি ১৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা। অর্থাৎ তার আর্থিক সম্পদের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি ঘটেছে। অন্যদিকে নন-ফিন্যান্সিয়াল সম্পদের পরিমাণও সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৬ হাজার ২৫০ টাকা, যা আগের বছর ছিল ২০ লাখ ৯২ হাজার টাকা। বিদেশে থাকা সম্পদের ক্ষেত্রেও সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে; এটি ৬৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৬১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার কোনো দায় বা ঋণ নেই।

অন্যদিকে তার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের সম্পদের হিসাব ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তার মোট সম্পদ এক বছরে কমেছে ৮৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরে তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকায়। তার আর্থিক সম্পদের পরিমাণ বড় ধরনের হ্রাস পেয়েছে এবং বর্তমানে তা ৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা, যেখানে এক বছর আগে ছিল ৯৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা। তবে নন-ফিন্যান্সিয়াল সম্পদের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ১১ হাজার টাকা। তার বিদেশে কোনো সম্পদ নেই এবং তার নামে ১৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকার দায় রয়েছে।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, এই সম্পদ বিবরণী প্রকাশের সিদ্ধান্ত এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা উদ্যোগের অংশ হিসেবে। ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন এবং ঘোষণা দিয়েছিলেন যে সব উপদেষ্টা দ্রুত তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও এটি নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পর্যায়ক্রমে উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করছে।

প্রকাশিত তালিকায় অন্যান্য উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্যও উঠে এসেছে, যা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর আর্থিক স্বচ্ছতা বিষয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিনের সম্পদ বেড়ে হয়েছে ৭ কোটি ১৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬ টাকা, যা আগে ছিল ৭ কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৭১৮ টাকা। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের সম্পদ ১৫ কোটি ৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ কোটি ২৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সম্পদও বেড়ে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারের সম্পদেও বৃদ্ধি দেখা গেছে।

স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের সম্পদ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বলে বিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। তার সম্পদ ৯৮ লাখ ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং এই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের সম্পদেও বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হিসেবে অবস্থান করছেন, যার মোট পরিসম্পদ ৯১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

তবে সব উপদেষ্টার ক্ষেত্রে সম্পদ বৃদ্ধি হয়নি। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সম্পদ কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকায়, যা আগে ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সম্পদও কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার সম্পদের পরিমাণ সামান্য হ্রাস পেয়েছে। এই ভিন্নধর্মী পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে সম্পদ বৃদ্ধি বা হ্রাস ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেন, বিনিয়োগ, উত্তরাধিকার এবং দায়-দেনার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল।

সরকারি মহল মনে করছে, সম্পদের বিবরণী প্রকাশের এই উদ্যোগ জনসাধারণের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারি উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সম্পদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে একদিকে যেমন জবাবদিহি বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে দুর্নীতির সম্ভাবনাও কমে। তারা মনে করেন, নিয়মিত সম্পদ ঘোষণা প্রথা চালু হলে প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি নাগরিকদের বিশ্বাস আরও শক্তিশালী হবে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এই সম্পদ বিবরণী কেবল ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের যে প্রতিশ্রুতি বর্তমান প্রশাসন দিয়েছে, এই প্রকাশনা সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত, যা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

সব মিলিয়ে প্রকাশিত তথ্য বলছে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সম্পদ গত বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যদিও তার পরিবারের মোট সম্পদের সামগ্রিক চিত্রে ভিন্নতা রয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য উপদেষ্টাদের সম্পদের ওঠানামা দেশের প্রশাসনিক নেতৃত্বের আর্থিক অবস্থার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তথ্য প্রকাশের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার সংস্কৃতি আরও সুদৃঢ় হবে এবং জনসাধারণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত