প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি পরিদর্শনে মাদারীপুরে নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধি দল। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই তারা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যান এবং ভোটের পরিবেশ ও প্রস্তুতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে ইইউ সদস্যরা প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনের অন্যান্য কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ইইউ লং টার্ম অবজারভার ইভা মোল্ট এবং লার্স জিরং ফরডাল সাংবাদিকদের জানান, মাদারীপুরের তিনটি আসনে তারা পরিদর্শন সম্পন্ন করেছেন এবং এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক। তারা বলেন, “আমরা এই টিমের দুই সদস্য এক মাস ধরে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছি। ভোট প্রক্রিয়ার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি। ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক রিপোর্ট এবং পরবর্তীকালে দুই মাস পর পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রদান করা হবে।”
মাদারীপুরে মোট তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে, যেখানে ২৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জেলার ৩৮১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২২৪টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ১৫৭টি ভোটকেন্দ্র সাধারণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৪৮ হাজার ৩২৭ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৩০৮ জন, নারী ভোটার ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭ জন এবং হিজড়া ভোটার ১২ জন।
নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন অস্ত্রধারী পুলিশ, তিনজন অস্ত্রধারী আনসার এবং ১০ জন লাঠিধারী আনসার দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে দুইজন করে অস্ত্রধারী পুলিশ ও আনসার এবং ১১ জন লাঠিধারী আনসার দায়িত্বে থাকবেন। জেলার প্রায় ৬০০ সেনাবাহিনী সদস্য টহল ও নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি উপজেলায় ১০০ করে সেনা সদস্য থাকবেন, সদর উপজেলায় থাকবেন ২০০ সেনা সদস্য। এছাড়া ছয়টি প্লাটুন বিজিবি এবং অর্ধশত র্যাব সদস্য নির্বাচনী মাঠে দায়িত্বে থাকবেন। জেলায় মোট ২৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন, যার মধ্যে মাদারীপুর-১ ও মাদারীপুর-২ আসনে ৭ জন করে এবং মাদারীপুর-৩ আসনে ১০ জন। পাশাপাশি নির্বাচনী কার্যক্রমে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও দায়িত্ব পালন করবেন।
মাদারীপুর-১ আসন শিবচর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৪ হাজার ২৮৯ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৯ হাজার ৪১ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৪৬ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২ জন। এই আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নাদিরা আক্তার মিঠু চৌধুরী (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম মিন্টু (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আকরাম হুসাইন (হাতপাখা), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইদ উবিন আহমদ হানজালা (রিক্সা), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী আবদুল আলী (কাস্তে) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাবলু (ফুটবল) প্রভৃতি।
মাদারীপুর-২ আসনে সদরের ১০টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও রাজৈর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন এবং ১টি পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৩২ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৬২১ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ১২ হাজার ৬০৩ জন এবং হিজড়া ভোটার ৮ জন। এই আসনে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে বিএনপির প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আলী আহমদ চৌধুরী (হাতপাখা), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সোবাহান (রিক্সা) প্রভৃতি রয়েছেন।
মাদারীপুর-৩ আসন কালকিনি উপজেলা, ডাসার উপজেলা এবং সদর উপজেলার নির্দিষ্ট ইউনিয়নগুলো নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮০৬ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৬৪৬ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৫ হাজার ১৫৮ জন এবং হিজড়া ভোটার ২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৩৪টি। এই আসনে ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যেমন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মো. রফিকুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা) এবং অন্যান্য প্রার্থী।
ইইউ প্রতিনিধি দলের নজরদারিতে ভোটারদের মধ্যে সাধারণ মানুষও আশ্বস্ত বোধ করেছেন। ভোট প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও নিরাপদ হবে, এটি নিশ্চিত করতে প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা দৃঢ়ভাবে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশের উপস্থিতি, আনসার ও সেনাবাহিনীর টহল এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের পর্যবেক্ষণ ভোটারদের নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল নির্বাচনী মাঠে আসলে প্রার্থী এবং ভোটার উভয়ই দায়িত্বশীল এবং সতর্কভাবে আচরণ করার প্রণোদনা পায়। মাদারীপুরের নির্বাচন পরিবেশ সুষ্ঠু ও নিরাপদ রাখার এই নজরদারিতে ভোটারদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ভোটে এই প্রক্রিয়া ভোটারদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।