প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সাবেক ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কমান্ডার হুসেইন কানানি সম্প্রতি এক চমকপ্রদ মন্তব্য করেছেন, যেখানে তিনি দাবি করেছেন, সৌদি আরবের কাছে বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে জানে। এই মন্তব্য তিনি সোমবার আরটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে করেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার পটভূমিতে কানানির এই মন্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করছে।
সাক্ষাৎকারে কানানি মার্কিন সাংবাদিক রিক সানচেজকে জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে সৌদি আরবের হাতে পারমাণবিক বোমা রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তা ভালভাবে জানে। স্পষ্টীকরণের জন্য তিনি পুনরায় বলেন, “হ্যাঁ, এটি সঠিক।” তিনি আরও যোগ করেন, ইসরাইল এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো—মোসাদ ও সিআইএ—ও এ বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। কানানি বলেছেন, “আমাদের ধারণা, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে সমর্থন করছে। তাদের লক্ষ্য শুধু সরকারকে পতন করা নয়, বরং পুরো দেশটিকে অস্থিতিশীল করা।”
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে গত জুনে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্রমশ উত্তপ্ত হয়েছে। এর পরের সময়ে, বিশেষ করে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে, ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। তেহরান বারবার অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে অস্থিরতা উস্কে দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার পরিস্থিতি কাজে লাগাচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে কানানি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালায়, তবে তেহরানের প্রথম প্রতিক্রিয়া সরাসরি আমেরিকান ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্যবস্তু নাও হতে পারে। বরং ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হতে পারে। তিনি আরও সতর্ক করেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য। তবে কানানি দাবি করেছেন, চীন বা রাশিয়ার অর্থনীতিকে ক্ষতি করতে চাই না। যুক্তরাষ্ট্রের উস্কানির জবাবে এমন পদক্ষেপ “অবশ্যই” হতে পারে।
ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে দেশটি বর্তমানে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতার লক্ষ্য অর্জন করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সাধারণত ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন। অর্থাৎ, ইরানের কর্মসূচি এখনও অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় সীমার নিচে রয়েছে, কিন্তু অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানানির মন্তব্যে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক প্রতিযোগিতা ও মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। এই ধরনের ঘোষণা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক এবং কূটনীতিকদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এ ধরনের তথ্য ঘিরে নিজেদের কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত।
ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। পারমাণবিক সক্ষমতা সংক্রান্ত এই ধরনের দাবিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দুই দেশের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের প্রতি নজর রাখছে। কানানির এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বশান্তির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের সাবেক এই কমান্ডারের বক্তব্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তা প্রতিফলিত হতে পারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব-ইরান সম্পর্কের মধ্যে এই উত্তেজনা বিশ্বজনীন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মোটের ওপর, হুসেইন কানানির বক্তব্য ইরান-সৌদি পারমাণবিক প্রতিযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চুক্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিল প্রশ্নকে সামনে এনেছে। বিশ্ব সম্প্রদায় এই দাবি ও প্রতিক্রিয়ার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে। তেহরান, রিয়াদ এবং ওয়াশিংটন এই তথ্যকে ঘিরে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।