ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য জাকাত আদায়ের বিধান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩ বার
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য জাকাত আদায়ের বিধান

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং দরিদ্রদের সহায়তায় জাকাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রথা। ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী এটি শুধুমাত্র আর্থিক দানের একটি কার্যক্রম নয়, বরং একটি ইবাদত, যা একজন মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে এবং তার সম্পদকে পবিত্র করার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে কখনও কখনও মুমিনদের মধ্যে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যখন ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত। এই অবস্থায় জাকাত আদায়ের বিষয়টি কিছুটা জটিল হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামের শিক্ষার আলোকে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য জাকাত আদায়ের সঠিক বিধানগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তার ঋণ পরিশোধ করা। যদি কোনো ব্যক্তি সম্পদের নিসাব পরিমাণ রাখেন, কিন্তু সেই সম্পদ দিয়ে ঋণ পরিশোধ না করে তা নিজের কাছে গচ্ছিত রাখেন, তবে জাকাত আদায় করা ফরজ হয়ে যায়। সাহাবি উসমান (রা.) রামাজান মাসের জাকাত সম্পর্কে বলেছেন, যদি কারো উপর ঋণ থাকে, তবে সে যেন প্রথমে ঋণ পরিশোধ করে এবং অবশিষ্ট সম্পদ নিসাবের পরিমাণে থাকলে তার জাকাত আদায় করে। এটি মুওয়াত্ত্বা মালেকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তাদের সম্পদ হতে ছাদাক্বাহ্ গ্রহণ করবে, যার দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে” (তওবা ৯/১০৩)। অর্থাৎ জাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদকে পবিত্র করা হয় এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের মাধ্যমে সামাজিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা হয়। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিও যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ রাখেন, তবে ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করতে হবে।

রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনু ওমর (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো সম্পদ অর্জন করে, সেটি তার মালিকানায় এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত জাকাত ফরজ গণ্য হবে না (তিরমিজি ৬৩২)। এটি নির্দেশ করে যে, সম্পদ অর্জনের সময়কালও জাকাতের হিসাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনু জাবাল (রা.)-কে ইয়ামেন প্রেরণ করে বলেছেন, আল্লাহ তাদের উপর তাদের সম্পদের মধ্য থেকে সাদাক্বাহ্ ফরজ করেছেন, যা ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হয়ে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হবে (বুখারি ১৩৯৫)।

ফসল এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রেও জাকাতের নিয়মাবলী নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বৃষ্টি বা ঝর্ণার পানি দ্বারা সিক্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফসলের উপর দশ ভাগের এক ভাগ জাকাত, এবং সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের ওপর বিশ ভাগের এক ভাগ জাকাত ওয়াজিব হবে (বুখারি ১৪৮৩)। এই বিধান থেকে বোঝা যায় যে, জাকাত শুধুমাত্র নগদ অর্থ বা স্থাবর সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষিজ উপার্জনেও প্রযোজ্য।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত তার ঋণ পরিশোধ না করেন, তার সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করা শর্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ, ঋণগ্রস্ত অবস্থায় সম্পদ থাকলেও তা যদি নিসাবের চেয়ে কম হয়, তবে জাকাত আদায় ওয়াজিব হবে না। তবে ঋণ পরিশোধের পর যদি সম্পদ নিসাবের পরিমাণে থাকে, তখন তা জাকাতের আওতায় আসে। ইসলামের এই নির্দেশনা সামাজিক ন্যায্যতা, আর্থিক ভারসাম্য এবং দরিদ্রদের সহায়তা নিশ্চিত করে।

শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে, জাকাত একটি ইবাদত এবং এটি ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্ধারিত। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য হলো প্রথমে ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে নিজ দায়িত্ব পালন করা এবং অবশিষ্ট সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করা। এটি শুধু ধর্মীয় নির্দেশই নয়, বরং সমাজে দরিদ্রদের সেবা ও সম্পদের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইসলামী পাণ্ডিত্য ও হাদিসের আলোকে বোঝা যায় যে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য জাকাত আদায়ের প্রক্রিয়া সুস্পষ্ট। ব্যক্তি যখন ঋণমুক্ত হন, তখন তার অবশিষ্ট সম্পদ যদি নিসাবের পরিমাণে পৌঁছায়, তখন সে জাকাত প্রদান করবে। এই প্রক্রিয়াটি সমাজে আর্থিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং দরিদ্রদের মাঝে সম্পদ বিতরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য জাকাত আদায় কেবল একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি সমাজকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য জাকাত আদায়ের বিধান স্পষ্ট। প্রথমে ঋণ পরিশোধ করা, তারপর অবশিষ্ট সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করা। ইসলামের এই নির্দেশনা অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করে এবং সমাজে দরিদ্রদের জন্য সহায়তার একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এই নিয়ম অনুসরণ করে একজন মুমিন ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেন না, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ন্যায়পরায়ণতা রক্ষা করতে সক্ষম হন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত