প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, নদীভাঙন, বায়ুদূষণ, বন উজাড়, প্লাস্টিক দূষণ এবং নগরায়ণের চাপের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন পরিবেশগত ঝুঁকির অন্যতম দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে চিহ্নিত, তখন রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলো কতটা কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য হবে—সেই প্রশ্নও সমানভাবে আলোচনায় এসেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষায় নানা পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে, যার মধ্যে রয়েছে ২৫ কোটি গাছ রোপণ, প্লাস্টিকের বোতলের বিনিময়ে গাছের চারা প্রদান, সিসার ব্যবহার কমানো, নদীভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো।
বিএনপি তাদের ইশতেহারের ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন’ অধ্যায়ে আগামী পাঁচ বছরে গ্রামীণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের অঙ্গীকার করেছে। দলটি বলছে, ১০ হাজার নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরি করে প্রায় ছয় লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। শুধু গাছ লাগানো নয়, সেগুলোর সংরক্ষণ ও তদারকির জন্য ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ চালুর কথাও বলা হয়েছে। দ্বীপ ও চরাঞ্চলে ড্রোনের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ, শহরে পার্ক, ফুটপাত ও খেলার মাঠসংলগ্ন এলাকায় সবুজায়ন এবং ছাদবাগানে কর-প্রণোদনার মতো উদ্যোগের কথাও রয়েছে তাদের পরিকল্পনায়। ভবন নির্মাণে ‘সবুজ পরিমাপক মানদণ্ড’ যুক্ত করে গ্রিন সার্টিফিকেশন চালুর প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
জ্বালানি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। একই সঙ্গে কার্বন ট্রেডিং মার্কেটে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এক বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরির লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতি বিভাগে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্ল্যান্ট স্থাপন এবং মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ রয়েছে। বন উজাড়, পাহাড় কাটা, বন্য প্রাণী হত্যা ও ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা হয়েছে।
তবে বিএনপির ইশতেহারে বায়ুদূষণ, বিশেষ করে ঢাকা শহরের ভয়াবহ বায়ুমান নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা না থাকায় পরিবেশবিদদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। শুষ্ক মৌসুমে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান প্রায়ই শীর্ষে থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত।
জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষায় ‘তিন শূন্য’ ভিশনের কথা বলেছে—শূন্য বর্জ্য, পরিবেশের শূন্য অবক্ষয় এবং শূন্য বন্যাঝুঁকি। তারা প্লাস্টিকের বোতলের বিনিময়ে গাছের চারা দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, যা নাগরিক সচেতনতা ও পুনর্ব্যবহার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। পলিথিন ব্যাগের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাগের ব্যবহার বাড়ানো, সব শিল্পকারখানায় বর্জ্যশোধন যন্ত্র স্থাপন নিশ্চিত করা এবং বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও কর্ণফুলী নদীর দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিতর্কিত ডাচ-ডেলটা মডেল অনুসরণের কথা বলায় পরিবেশবিদদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বিপুল পলিপ্রবাহের বাস্তবতায় কংক্রিটের বাঁধনির্ভর সমাধান কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। একই সঙ্গে তারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশকে নেতৃত্বের আসনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নে সমীক্ষা চালানো এবং আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের কথাও তাদের ইশতেহারে রয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সংযোগকে গুরুত্ব দিয়ে শিল্পদূষণ রোধে প্রতিটি কারখানায় ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রথম দুই থেকে তিন বছর সরকার আংশিক ব্যয় বহন করবে এবং পরবর্তী সময়ে শিল্পমালিকদের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত হবে—এমন পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষায় খেলনা ও রঙে সিসার ব্যবহার বন্ধ এবং ভোক্তাসামগ্রীতে সিসা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি। নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে স্যাটেলাইট ইমেজ, হাইড্রোগ্রাফিক ডেটা ও কমিউনিটি ম্যাপিং ব্যবহারের পরিকল্পনা তাদের ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য দিক।
এনসিপি তিস্তা ব্যারাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সাপেক্ষে নির্মাণের কথা বলেছে। একই সঙ্গে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, জেলেদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নদীতীরভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে নদীভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছে। আর্সেনিক সমস্যার সমাধান, ইটভাটা ও পুরোনো যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং পাঁচ বছরের মধ্যে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যও তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, দলগুলোর ইশতেহারে পরিবেশ বিষয়ক প্রতিশ্রুতি আগের তুলনায় বিস্তারিত হয়েছে, যা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্প যেমন ব্যারেজ নির্মাণের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলিপ্রবাহ বিবেচনায় না নিলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন পরিবেশ তদারকি কমিটি গঠন এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করা হলে জনআস্থা বাড়বে।
বাংলাদেশের মানুষ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা প্রতিদিন অনুভব করছে—উপকূলের লবণাক্ততা, উত্তরাঞ্চলের খরা, আকস্মিক বন্যা, নগরের দূষিত বায়ু ও নদীর দখলদূষণ তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো তাই কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ নয়; বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও জীবনের প্রশ্ন। ভোটাররা এখন দেখতে চান, প্রতিশ্রুত সবুজ অঙ্গীকার কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে নাকি বাস্তবের মাটিতে শেকড় গেঁড়ে টেকসই পরিবর্তনের পথ দেখায়।