নারীর নিরাপদ অংশগ্রহণে জাতিসংঘের আহ্বান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭ বার
নারীর নিরাপদ অংশগ্রহণে জাতিসংঘের আহ্বান

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নারীদের নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশে জাতিসংঘ কার্যালয়। নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে রাজনৈতিক উত্তাপ, প্রচারণার প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনার মধ্যেই জাতিসংঘের এই বার্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সংস্থাটি বলেছে, একটি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তখনই শক্তিশালী হয়, যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিক ভয়ভীতি, সহিংসতা ও বৈষম্যের আশঙ্কা ছাড়াই অংশ নিতে পারেন।

বুধবার দুপুরে বাংলাদেশে জাতিসংঘ কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় এ আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থবহ অংশগ্রহণ সবার মৌলিক অধিকার। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, নারী ও মেয়েদের অধিকার রক্ষায় সচেতন ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন, কারণ তারা প্রায়শই রাজনৈতিক সহিংসতা, সামাজিক বাধা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। প্রতিবন্ধী নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী এবং ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও প্রকট।

জাতিসংঘ কার্যালয় জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন নারী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নারী প্রার্থী ও ভোটারদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হয়রানির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন সহিংসতা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের লক্ষ্য করে আক্রমণের ঘটনা বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার রক্ষাকারী নারীরা সাইবার বুলিং, ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও তৈরি, পরিকল্পিত চরিত্রহনন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিকৃত বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জাতিসংঘের বিবৃতিতে উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার যেমন রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি তা অপব্যবহারের ক্ষেত্রও প্রসারিত করেছে। বিশেষ করে নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রমণ, সামাজিক অপমান এবং ভীতি সৃষ্টির কৌশল নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক নারী রাজনীতিক জানিয়েছেন, অনলাইন হুমকি ও মানহানিকর প্রচারণা তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করে এবং পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে চাপ বাড়ায়। এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের আহ্বান নির্বাচনী পরিবেশকে মানবিক ও নিরাপদ রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর নতুন করে আলোকপাত করেছে।

জাতিসংঘ বলেছে, নারীদের অর্থপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা শুধু মানবাধিকার ইস্যু নয়, বরং এটি টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গবেষণা বলছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নীতি প্রণয়নে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি বাড়ায়, সামাজিক ন্যায়বিচার জোরদার করে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তা এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার কথাও জানিয়েছে জাতিসংঘ। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে বিশ্ব সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। ভোটার হিসেবে নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রার্থী হিসেবে তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও স্পষ্ট আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারীর প্রতি কোনো ধরনের হয়রানি, সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক নেতা, তাঁদের দল ও সমর্থকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, যাতে নারী প্রার্থী ও ভোটাররা নিরাপদে তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য নারীর অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা অপরিহার্য—এই বার্তাই জাতিসংঘ পুনর্ব্যক্ত করেছে।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ডিজিটাল অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করার যে কোনো প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ক্ষতিকর বলে তারা মনে করেন।

বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা, আইনের শাসন ও প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে বলে জাতিসংঘ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সংস্থাটি। নির্বাচন শুধু প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় নারীদের সমান ও নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে জাতিসংঘের এই বার্তা তাই কেবল আনুষ্ঠানিক আহ্বান নয়; এটি একটি নৈতিক অবস্থান। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন ঘৃণা বা সহিংসতায় রূপ না নেয় এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার যেন কারও অধিকার খর্ব না করে—এই প্রত্যাশা থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এ বার্তা এসেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের নিরাপদ ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা—এই তিনটি দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গণতন্ত্র তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিটি কণ্ঠস্বর সমান মর্যাদায় শোনা হয়। আসন্ন নির্বাচন সেই পরীক্ষার আরেকটি অধ্যায় হয়ে উঠতে যাচ্ছে, যেখানে নারীর অংশগ্রহণই হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত