গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়, সংস্কারের দ্বার উন্মুক্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২১ বার
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়, সংস্কারের দ্বার উন্মুক্ত

প্রকাশ:  ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন ও আলোচনার পর অবশেষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় মৌলিক সংস্কারের পথ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে গেল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি, যেখানে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ‘না’-এর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি সমর্থন। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত ফলাফল অনুযায়ী, গণভোটে মোট ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন। ভোটগ্রহণ শেষে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-এর জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ। প্রাথমিক ফলাফলে ভোট পড়ার হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ বলা হলেও রাতে সংশোধিত হিসেবে তা ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়। একই সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের সংখ্যায়ও সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়।

গণভোটে বাতিল হওয়া ব্যালট পেপারের সংখ্যা ছিল ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি, যা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কাড়ে। এলাকাভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের হার তুলনামূলক বেশি এবং বাতিল ব্যালটের সংখ্যা তুলনামূলক কম। ঢাকা-১০ আসনে ৩ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি ভোটারের মধ্যে ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৯ ভোট, ‘না’ পেয়েছে ৩৪ হাজার ৬৪১ ভোট, আর বাতিল হয়েছে ৬ হাজার ৭৯৬টি ব্যালট। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে ৩১ হাজারের বেশি ব্যালট বাতিল হয়েছে, যদিও সেখানেও ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে।

দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণের মধ্যে কেবল খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—এই তিন আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে। বাকি সব আসনে ‘হ্যাঁ’ প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে অঞ্চলভেদে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয়ভাবে সংস্কার প্রস্তাবের প্রতি জনগণের সুস্পষ্ট সমর্থন প্রতিফলিত হয়েছে।

এই গণভোটের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ অন্তর্ভুক্ত সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমিশন গঠন করে সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়।

প্রথমে গঠিত ছয়টি কমিশনের ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ থেকে আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়। এগুলো নিয়েই তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এর মধ্যে ৪৮টি সরাসরি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সেগুলো বাস্তবায়নে গণভোট প্রয়োজন হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ১৯টি প্রস্তাবকে মৌলিক সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

সংবিধান-সম্পর্কিত এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের তিনটি স্তর নির্ধারণ করা হয়। প্রথম স্তরে আইনি ভিত্তি দিতে রাষ্ট্রপতি ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন। দ্বিতীয় স্তরে অনুষ্ঠিত হলো গণভোট, যেখানে জনগণ সরাসরি মতামত দিলেন। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন তৃতীয় স্তর শুরু হবে। আগামী জাতীয় সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। সংসদ সদস্যরাই এই পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করবেন।

সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। বিদ্যমান সংবিধানে প্রায় সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত। প্রস্তাবিত সংস্কার অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা সীমিত হবে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাড়বে। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি সরাসরি এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারবেন।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্বে থাকতে পারবেন এবং একই ব্যক্তি একসঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকতে পারবেন না—এমন বিধানও প্রস্তাবিত হয়েছে। সংসদ সদস্যদের ভোটদানের স্বাধীনতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে, যাতে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় মতপ্রকাশের সুযোগ বিস্তৃত হয়। আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে এবং উচ্চকক্ষ গঠিত হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে। সংবিধান সংশোধনে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন হবে। ফলে একক দলীয় উদ্যোগে সংবিধান পরিবর্তন কঠিন হয়ে পড়বে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য জোরদার হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই গণভোট শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের নজির। যদিও কিছু রাজনৈতিক দল নির্দিষ্ট প্রস্তাবে ভিন্নমত জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে জনগণের রায় সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।

তবে সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার সময়সীমা বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবায়ন আদেশে নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন না হলে কী হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে রাজনৈতিক ঐকমত্য বজায় রাখা এবং সময়সীমার মধ্যে কার্যকর আইনগত সংশোধন সম্পন্ন করা হবে বড় পরীক্ষা।

গণভোটের ফল তাই কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। জনগণের প্রত্যাশা এখন দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের দিকে। সংস্কারের এই যাত্রা সফল হলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত