গাজায় এনজিও নিষেধাজ্ঞা, বিতর্কে ইসরায়েল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
গাজায় এনজিও নিষেধাজ্ঞা, বিতর্কে ইসরায়েল

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজায় চলমান মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ করে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত এবং সরকারের সঙ্গে সমন্বয়পূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে— এমন কিছু সংস্থাকে অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তেল আবিবের বিরুদ্ধে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম The New Humanitarian-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গাজায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা বহু প্রতিষ্ঠিত এনজিওকে নতুন নিবন্ধন আইনের শর্ত দেখিয়ে কার্যত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রণীত নতুন নিবন্ধন কাঠামোতে এমন কিছু শর্ত সংযোজন করা হয়েছে, যা অনেক আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে তথ্য বিনিময়, কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন, তহবিলের উৎস ও কর্মীদের পরিচয় সংক্রান্ত কড়াকড়ি শর্তকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। এসব শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় গাজায় কার্যরত অন্তত ৩৭টি ত্রাণ সংস্থা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে জাতিসংঘের বাইরে প্রায় সব সুপরিচিত আন্তর্জাতিক এনজিও রয়েছে, যারা বহু বছর ধরে খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয় ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছিল।

নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা Médecins Sans Frontières, শরণার্থী সহায়তায় পরিচিত Norwegian Refugee Council, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা Mercy Corps, ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা সহায়তায় সক্রিয় Medical Aid for Palestinians, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠন Oxfam এবং ১৯৪৮ সাল থেকে গাজায় কাজ করে আসা American Friends Service Committee। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, নতুন আইনের শর্ত বাস্তবায়ন করলে তাদের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার নীতি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, গাজায় কার্যরত সব সংস্থার কার্যক্রম স্বচ্ছ ও নিরাপত্তা-সম্মত হওয়া নিশ্চিত করতেই নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে ত্রাণ কার্যক্রমের আড়ালে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে কি না— তা যাচাই করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলেই দাবি করা হয়।

তবে মানবাধিকার আইনজীবী ও ত্রাণকর্মীদের একাংশের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়; বরং গাজার মানবিক কাঠামো পুনর্গঠনের একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলোকে পাশ কাটিয়ে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত, নবনিবন্ধিত বা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে— এমন প্রায় দুই ডজন সংস্থাকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে একটি সমান্তরাল ত্রাণব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গাজার সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি নিছক নীতিগত বিতর্ক নয়; বরং জীবনের প্রশ্ন। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ, অবকাঠামো ধ্বংস, চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট এবং নিরাপদ পানির ঘাটতির মধ্যে বসবাসকারী লাখো মানুষ বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালগুলোতে ওষুধের সরবরাহ, শরণার্থী শিবিরে খাদ্য বিতরণ, যুদ্ধাহতদের পুনর্বাসন— এসব ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক ছিল গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ করে সেই সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ হয়ে গেলে ত্রাণ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা।

মানবিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, তারা নিরাপত্তা উদ্বেগকে অস্বীকার করছেন না। তবে নিবন্ধন আইনের কিছু ধারা তাদের কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও সুবিধাভোগীদের সুরক্ষা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করার সময় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি মৌলিক নীতি। সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো শর্ত আরোপ করা হলে সংস্থাগুলোর জন্য তা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে উদ্বেগ জানিয়েছে বলে জানা গেছে। জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন, গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবাহ বজায় রাখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চলমান সংঘাতের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির হার বেড়েছে, শিশুদের মধ্যে মানসিক আঘাতের প্রভাবও গভীরতর হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় ত্রাণ কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কেবল প্রশাসনিক প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থার সঙ্গেও জড়িত। যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ সংস্থাগুলোকে সরিয়ে নতুন কাঠামো গড়ে তোলা হয়, তবে বৈশ্বিক দাতাদের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তহবিল প্রবাহ কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে গাজার সাধারণ মানুষের ওপর।

অন্যদিকে ইসরায়েলপন্থী বিশ্লেষকরা বলছেন, যেসব সংস্থা নতুন শর্ত মেনে কাজ করতে রাজি হয়েছে, তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করা সহজ হবে। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে এবং ত্রাণের অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এই প্রক্রিয়ায় যদি স্বচ্ছতা ও বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা হয়, তবে মানবিক সহায়তার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

গাজার ভেতরে বাস্তবতা হলো— রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভিঘাত সবচেয়ে আগে এসে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। একটি শিশুর জন্য সময়মতো টিকা পাওয়া, এক আহত ব্যক্তির জন্য অস্ত্রোপচারের সুযোগ, বা এক বাস্তুচ্যুত পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়— এসবের পেছনে কাজ করে জটিল আন্তর্জাতিক সমন্বয়। সেই সমন্বয়ে ভাঙন ধরলে মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল। নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা সংস্থাগুলোর কেউ কেউ আইনি প্রক্রিয়ায় আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার কেউ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজছে। একই সঙ্গে নতুন অনুমোদন পাওয়া সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তবে গাজার মানুষের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই— সহায়তা কি নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মানবিক নীতির প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকারের ওপর। গাজার সংকট বহুস্তরীয়; তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। বিতর্কের কেন্দ্রে যে আইন বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া, তার বাইরে গিয়ে মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত— মানুষের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত