প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে যখন ফলাফল বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক সমীকরণের হিসাব-নিকাশ চলছে, তখন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রাম এক অনন্য নজির গড়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। একই গ্রাম থেকে তিনজন প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় গ্রামজুড়ে বইছে আনন্দের বন্যা। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং গহিরার সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের নতুন সংযোজন।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৪টিতে বিএনপির প্রার্থী এবং দুটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি থেকে জয়ী তিনজনের বাড়ি রাউজানের গহিরা গ্রামে। এই তিনজন হলেন চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে নির্বাচিত গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে নির্বাচিত হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর) আসনে নির্বাচিত সাঈদ আল নোমান।
চট্টগ্রাম-৬ আসনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ২০১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইলিয়াছ নুরী মোমবাতি প্রতীকে পেয়েছেন ২৬ হাজার ৬৯৬ ভোট। ভোটের ব্যবধানই বলে দেয়, এ আসনে তার অবস্থান ছিল দৃঢ়। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক প্রভাব তার পক্ষে কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিজয়ী হুম্মাম কাদের চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ৩৬৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী ডা. এ টি এম রেজাউল করিম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৬৫ ভোট। হুম্মাম কাদের চৌধুরী রাজনৈতিকভাবে পরিচিত একটি পরিবারের সদস্য। তিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও তরুণ প্রজন্মের সমর্থন তাকে এগিয়ে দিয়েছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-ডবলমুরিং) আসনে ১৩৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩২টির ফলাফলে সাঈদ আল নোমান পেয়েছেন ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৭৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের শামসুজ্জামান হেলালি পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৩৪ ভোট। নগরকেন্দ্রিক এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তুলনামূলক বেশি। তবে শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে সাঈদ আল নোমান স্পষ্ট ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন।
একই গ্রামের তিনজনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া নিছক কাকতালীয় ঘটনা নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় প্রবীণরা। গহিরা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয় একটি গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এখানকার পরিবারগুলো শিক্ষা, ব্যবসা ও রাজনীতিতে প্রভাবশালী। ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি নতুন নয়, তবে একই নির্বাচনে তিনজনের বিজয় নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই গহিরা গ্রামে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ, আনন্দ মিছিল এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্য দেখা গেছে। তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গহিরার নাম ছড়িয়ে দিচ্ছেন গর্বের সঙ্গে। প্রবীণদের কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীনতার পর এত বড় রাজনৈতিক অর্জন এই গ্রাম আর দেখেনি।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ফলাফল শুধু গ্রামীণ গর্বের বিষয় নয়; বরং আঞ্চলিক রাজনীতির শক্ত অবস্থানও নির্দেশ করে। রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চল থেকে একাধিক প্রভাবশালী নেতা জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রেখেছেন। এবার সেই ধারাবাহিকতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ, জোটভিত্তিক সমীকরণ এবং স্থানীয় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত প্রভাব— সবকিছু মিলিয়ে ভোটের ফলাফল গঠিত হয়েছে। চট্টগ্রামে বিএনপির ব্যাপক সাফল্য দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় জনসমর্থনের প্রতিফলন বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো ফলাফল বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের কথা বলছে।
গহিরার মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক বড়। তারা চান, তাদের গ্রাম থেকে নির্বাচিত তিন সংসদ সদস্য নিজ নিজ আসনের উন্নয়নের পাশাপাশি জন্মভূমির উন্নয়নেও বিশেষ ভূমিকা রাখবেন। স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন— এসব বিষয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। গ্রামের এক শিক্ষক বলেন, “আমাদের গর্ব আছে, কিন্তু দায়িত্বও আছে। এখন দেখার বিষয়, তারা মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারেন।”
রাজনীতিতে পারিবারিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা— দুইয়ের সমন্বয়েই এই সাফল্য এসেছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটারদের আস্থা ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের উত্তাপ শেষে এখন সময় বাস্তবায়নের।
গহিরা গ্রাম আজ জাতীয় আলোচনায়। একটি ছোট গ্রাম থেকে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই সাফল্য শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি স্থানীয় রাজনীতির শক্তি, সংগঠনের গভীরতা এবং ভোটারদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। সময়ই বলবে, এই অর্জন ভবিষ্যতে কী ধরনের রাজনৈতিক ও উন্নয়নধারার জন্ম দেয়। তবে আপাতত গহিরা জেগে আছে আনন্দে, আর সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে— এক গ্রামের এই অনন্য গল্পের দিকে।