প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন বিজয়-পরাজয়ের বিশ্লেষণ চলছে, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে ফল মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা ৪৪ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই ঘোষণা দেন এবং দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক উত্তাপ এবং দীর্ঘ প্রচার-প্রচারণার পর দেওয়া এই বার্তাকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। পোস্টে জামায়াত আমির লিখেছেন, গত কয়েক মাসে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থক অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সময়, শক্তি ও বিশ্বাস উৎসর্গ করে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন। কেউ কেউ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাদের সাহসিকতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে— এমন মন্তব্য করে তিনি দলীয় কর্মীদের মনোবল অটুট রাখার আহ্বান জানান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসনে জয় পেয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এই ফলাফলের মাধ্যমে দলটির সংসদীয় উপস্থিতি আগের তুলনায় প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি লেখেন, “এটা কোনো ধাক্কা নয়। এটি একটি ভিত্তি।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত রয়েছে। নির্বাচনে সরকার গঠন না করতে পারলেও নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা স্পষ্ট।
ডা. শফিকুর রহমান তার পোস্টে রাজনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালে বিএনপি মাত্র ৩০ আসনে নেমে এসেছিল, কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরের পথ পেরিয়ে ২০২৬ সালে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে। এই উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে ধৈর্য, সাংগঠনিক শক্তি ও জনআস্থা অর্জনই মূল চাবিকাঠি। তার ভাষায়, লক্ষ্য পরিষ্কার রাখতে হবে, বিশ্বাস অর্জন করতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য দায়িত্বশীলভাবে প্রস্তুত হতে হবে।
এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। নির্বাচনের পর পরাজিত বা বিরোধী অবস্থানে থাকা দলের প্রতিক্রিয়া গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ফলাফলকে মেনে নেওয়া এবং সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকে কাজ করার অঙ্গীকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
জামায়াত আমির আরও উল্লেখ করেন, নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল নির্বাচনী প্রচারণায় নয়; বরং জনগণের রায়কে কীভাবে গ্রহণ করা হয় তার ওপর নির্ভর করে। এই মন্তব্যে রাজনৈতিক পরিপক্বতার একটি সুর লক্ষ করা যায়। তিনি স্পষ্ট করেন, তাদের আন্দোলন কখনো একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছিল না; বরং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করা, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র গঠনই তাদের উদ্দেশ্য।
সংসদে বিরোধী দল হিসেবে কী ধরনের ভূমিকা পালন করবে— সে বিষয়েও ইঙ্গিত দেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াত একটি নীতিবান, দায়িত্বশীল ও শান্তিপূর্ণ বিরোধী দল হিসেবে কাজ করবে। সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জাতীয় অগ্রগতিতে গঠনমূলক অবদান রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। নীতিগত ও শান্তিপূর্ণ রাজনীতির প্রতি দলের অঙ্গীকার অটল থাকবে বলেও জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দল যদি কার্যকরভাবে সংসদীয় বিতর্কে অংশ নেয়, নীতিগত প্রশ্ন তোলে এবং বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করে, তবে তা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করে। একই সঙ্গে সরকারকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে উৎসাহিত করে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিরোধী দলের সামনে সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখা, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং জনসমর্থন বিস্তৃত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। নির্বাচনী ফলাফলকে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে নীতি, গবেষণা ও প্রস্তাবনাভিত্তিক রাজনীতির দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমানের ঘোষণাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দলীয় সমর্থকরা এটিকে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, বিরোধী দলের ভূমিকায় বাস্তব কার্যক্রমই হবে আসল পরীক্ষা। কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতির প্রমাণ দিতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বহুবার উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পথে বিরোধী রাজনীতি করার অঙ্গীকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এখন দেখার বিষয়, সংসদে এবং সংসদের বাইরে জামায়াতে ইসলামী কীভাবে তাদের ঘোষিত অবস্থান বাস্তবায়ন করে।
নির্বাচনের ফলাফল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও রাজনৈতিক যাত্রার শেষ নয়। বরং নতুন অধ্যায়ের সূচনা। জামায়াত আমিরের ভাষায়, এটি একটি ভিত্তি। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দলটি ভবিষ্যতে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা নির্ভর করবে তাদের কৌশল, জনসম্পৃক্ততা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর। দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকা কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর সবার।