বেতন ছাড়াও এমপিরা যেসব বিশেষ সুবিধা পান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৯ বার
বেতন ছাড়াও এমপিরা যেসব বিশেষ সুবিধা পান

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নতুন সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে দেশের আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। শুক্রবার রাতে ২৯৭ জন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এই নতুন অধ্যায়। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের মধ্যে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব, ক্ষমতা এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনেকেই জানতে চান, সংসদ সদস্যরা মূল বেতনের বাইরে আর কী ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা পান এবং সেগুলোর পরিধি কতটা বিস্তৃত।

বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট আইনের মাধ্যমে, যার নাম ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট (রিমিউনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার, ১৯৭৩’। এই আইনের আওতায় সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা, প্রশাসনিক সহায়তা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ নির্ধারিত হয় এবং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে তা সংশোধন করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে এই আইনে সংশোধন আনা হয়, যার মাধ্যমে বর্তমান কাঠামো কার্যকর রয়েছে।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য মাসিক মূল বেতন হিসেবে ৫৫ হাজার টাকা পান। তবে এই বেতনের বাইরেও দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রদান করা হয়, যা তাদের প্রশাসনিক কাজ, নির্বাচনী এলাকার তদারকি এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচনী এলাকা পরিচালনার জন্য মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হয়, যা মূলত স্থানীয় পর্যায়ে অফিস পরিচালনা, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

সংসদ সদস্যদের জন্য আপ্যায়ন ভাতা হিসেবে মাসে ৫ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সময় জনগণ, রাজনৈতিক কর্মী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হয়। এই আপ্যায়ন ভাতা সেই দায়িত্ব পালনে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

পরিবহন সুবিধা সংসদ সদস্যদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিবহন খরচ বাবদ প্রতি মাসে ৭০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়। এই অর্থের মধ্যে জ্বালানি ব্যয়, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকের বেতন অন্তর্ভুক্ত থাকে। একজন সংসদ সদস্যকে নিয়মিত রাজধানী ও নির্বাচনী এলাকার মধ্যে যাতায়াত করতে হয় এবং বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হয়। ফলে এই পরিবহন ভাতা তাদের দায়িত্ব পালনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

এ ছাড়া অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়, যা অফিস ভাড়া, সহকারী কর্মচারীর খরচ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হয়। লন্ড্রি ভাতা হিসেবে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং বিবিধ খরচ বাবদ ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়, যা সংসদ সদস্যদের দৈনন্দিন আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

যানবাহন সুবিধার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা বিশেষ সুযোগ পেয়ে থাকেন। তারা শুল্ক, ভ্যাট এবং অন্যান্য করমুক্ত সুবিধায় একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করতে পারেন। এই সুবিধা তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়ক হিসেবে দেওয়া হয়। দায়িত্বকাল পাঁচ বছর পূর্ণ হলে একই সুবিধায় আবারও একটি নতুন গাড়ি আমদানির সুযোগ রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে নির্ধারিত।

ভ্রমণ সুবিধাও সংসদ সদস্যদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা বিমান, রেল অথবা নৌপথে ভ্রমণ করলে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড় গুণ পর্যন্ত ভাতা পেতে পারেন। সড়কপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও কিলোমিটারপ্রতি নির্ধারিত ভাতা দেওয়া হয়। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণের জন্য বছরে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্রমণ ভাতা দেওয়া হয় অথবা বিকল্প হিসেবে ট্রাভেল পাসের সুবিধা পাওয়া যায়। এই সুবিধাগুলো মূলত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকা এবং রাজধানীর মধ্যে যোগাযোগ সহজ করার জন্য নির্ধারিত হয়েছে।

সংসদ সদস্যরা দায়িত্ব পালনের সময় দৈনিক ভাতাও পেয়ে থাকেন। দায়িত্বস্থলে অবস্থান করলে প্রতিদিন ৭৫০ টাকা দৈনিক ভাতা এবং ৭৫ টাকা যাতায়াত ভাতা দেওয়া হয়। সংসদ অধিবেশন অথবা সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অংশগ্রহণ করলে দৈনিক ভাতা ৮০০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা ২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে।

চিকিৎসা সুবিধার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যরা বিশেষ সুযোগ পান। তারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা ভোগ করতে পারেন। পাশাপাশি মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসাভাতা দেওয়া হয়। এর ফলে তারা সরকারি হাসপাতাল এবং নির্ধারিত চিকিৎসা কেন্দ্রে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন।

সংসদ সদস্যদের জন্য সরকারি বীমা সুবিধাও রয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনায় মৃত্যু অথবা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধা প্রযোজ্য হয়। এই সুবিধা তাদের দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রদান করা হয়। পাশাপাশি বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত একটি ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, যা সামাজিক এবং মানবিক কাজে ব্যয় করা যায়।

টেলিযোগাযোগ সুবিধার অংশ হিসেবে সংসদ সদস্যদের বাসভবনে সরকারি খরচে টেলিফোন সংযোগ দেওয়া হয়। মাসিক টেলিফোন বিল এবং কল খরচ বাবদ ৭ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ থাকে। আধুনিক যুগে যোগাযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় এই সুবিধা সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সংসদ সদস্যরা যে ভাতাগুলো পান, সেগুলো আয়করমুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ এই ভাতার ওপর কোনো আয়কর প্রযোজ্য হয় না।

বাংলাদেশের আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের জন্য নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধাও দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদ সদস্যদের এই সুবিধাগুলো ব্যক্তিগত বিলাসিতার জন্য নয়, বরং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন নিশ্চিত করার জন্য দেওয়া হয়। নির্বাচনী এলাকার জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা এবং জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার জন্য এই সুবিধাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, সংসদ সদস্যরা মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভাতা, প্রশাসনিক সহায়তা, পরিবহন সুবিধা, চিকিৎসা সুবিধা এবং যোগাযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। এই সুবিধাগুলো তাদের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত