প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফরিদপুরের জনপদ সালথা ও আশপাশের এলাকায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভোট শেষ হওয়ার পরও যখন মানুষের প্রত্যাশা থাকে শান্তি ও স্থিতিশীলতার, তখন দফায় দফায় সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই পরিস্থিতিতে ফরিদপুর-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার দুপুরে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে শামা ওবায়েদ বলেন, নির্বাচনের পর মানুষের প্রত্যাশা থাকে উন্নয়ন, সহাবস্থান এবং একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি সালথাবাসীর উদ্দেশে বলেন, কোনো ধরনের সহিংসতা বা প্রতিহিংসা কাম্য নয়। যারা হামলা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, “আপনারা শান্ত থাকুন, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন সংকট তৈরি করে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল থেকেই সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বর্দী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা কাটাকাটি এবং পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষের সময় বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। অনেক পরিবার আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় নেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বা নিরাপদ স্থানে।
ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কয়েকজন জানান, তারা হঠাৎ করেই হামলার শিকার হয়েছেন। অনেকেই তাদের ঘরের আসবাবপত্র, মূল্যবান জিনিসপত্র এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী হারিয়েছেন। কেউ কেউ জীবনের সঞ্চয় দিয়ে তৈরি করা ঘরবাড়ি পুড়ে যেতে দেখেছেন অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে। তাদের চোখে ছিল আতঙ্ক, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার ছাপ।
শামা ওবায়েদ ইসলাম এসব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেন এবং সমাজের সবাইকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা আমাদেরই ভাই-বোন। তাদের এই দুর্দিনে সাহায্য করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি আশ্বাস দেন, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর আগের দিন শুক্রবারও সালথার রামকান্তপুর ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একটি মসজিদে ভোট দেওয়া নিয়ে তর্কের জেরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে বিএনপি সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে অন্তত ১১ জন আহত হন এবং কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুর চালানো হয়। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
এই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এবং অনেকেই অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছে। বাজারে ক্রেতা কমে গেছে এবং অনেক দোকান আগেভাগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নতুন করে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সহিংসতার ঘটনা নতুন কিছু নয়, তবে প্রতিবারই এটি মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শামা ওবায়েদ ইসলাম তার বক্তব্যে আরও বলেন, নতুন বাংলাদেশে সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কোনো স্থান নেই। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, “আমি চাই সালথা হোক শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের একটি মডেল। এখানে কোনো ধরনের সন্ত্রাস বা সহিংসতা বরদাশত করা হবে না।”
তিনি স্থানীয় জনগণ, রাজনৈতিক কর্মী এবং সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সহিংসতায় রূপ নেওয়া উচিত নয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা।
এদিকে সহিংসতার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। অনেকেই সরকারের সহযোগিতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তার আশায় দিন গুনছেন। তাদের প্রত্যাশা, এই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি আর হবে না এবং তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
সালথার এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন শুধু ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পরেও শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল একটি সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।