প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত গণভোট এবং তার মাধ্যমে প্রকাশিত জনরায় এখন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এই গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়, বরং দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির ওপর বর্তায়— এমনটাই মনে করছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই সংস্কার বাস্তবায়নে আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়েও বড় বিষয় হলো রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা, যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কোনো রাজনৈতিক দলের নেই।
শনিবার সকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন। সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল এবং এর তাৎপর্য নিয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন।
আলী রীয়াজ বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবল আইনের লিখিত ধারা অনুসরণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হয়। তিনি বলেন, “আইনগত বিবেচনার চেয়েও রাজনীতিতে প্রথম এবং প্রধান বিবেচনাটা আপনাকে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে।” তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, গণভোটে জনগণ যে মতামত দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা, যা সম্মান করা তাদের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে তাদের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। এটি কোনো পরোক্ষ অনুমোদন নয়, বরং একটি প্রত্যক্ষ জনরায়। তাই এই জনরায়কে বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক দায়িত্ব। তিনি মনে করেন, জনগণের এই সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা হলে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকার গঠন করতে যাওয়া দল বিএনপির কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি কেবল আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, “সার্বভৌম জনগণের অভিপ্রায় হিসেবে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলেরই এ বিষয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আছে।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান যে, গণতন্ত্রে জনগণের মতামতই চূড়ান্ত এবং সেই মতামত বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব।
আলী রীয়াজ বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিভিন্ন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং গণভোটের সময়ও জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় শুধু সরকারের কোনো একক উদ্যোগ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের একটি সম্মিলিত অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণ যে অনুমোদন দিয়েছেন, তা কিছুটা পরোক্ষ হলেও গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি তাদের মতামত দিয়েছেন। এই সরাসরি জনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। তিনি মনে করেন, এটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা ভবিষ্যতের রাষ্ট্র কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সমন্বয় এবং সিদ্ধান্তের ওপর। তবে তিনি উল্লেখ করেন, গণভোটে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। তিনি বলেন, ছয় মাসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া শেষ করার কথা রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা এবং আন্তরিকতা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে যে সুস্পষ্ট জনরায় প্রকাশিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বর্তায়। তিনি সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানান, তারা যেন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে এই জনরায় বাস্তবায়নে কাজ করে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক বিভাজন নয়, বরং জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। জনগণ যে আস্থা প্রকাশ করেছে, তা রক্ষা করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই আস্থা ভঙ্গ হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনের একপর্যায়ে তাকে নতুন কোনো দায়িত্বে দেখা যাবে কি না— এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি তার পেশাগত জীবনে ফিরে যেতে চান। তিনি বলেন, “আমি আমার পেশায় ফিরে যেতে চাই এবং সেটা যত দ্রুত সম্ভব।” তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি তার বর্তমান দায়িত্বকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্রহণ করেছিলেন এবং এখন তিনি তার পূর্বের পেশায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে তিনি গণভোটের প্রচার এবং জনসচেতনতা তৈরিতে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এই গণভোটকে সফল করেছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, দেশের জনগণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সচেতন এবং দায়িত্বশীল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলী রীয়াজের এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং একই সঙ্গে একটি আহ্বান, যাতে তারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করে।
সব মিলিয়ে, গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনরায় দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে। এখন সবার নজর রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে— তারা এই জনরায়কে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।