জেনেভায় ফের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পারমাণবিক সংলাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
জেনেভায় ফের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পারমাণবিক সংলাপ

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক আশঙ্কার আবহে আবারও আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। বহুদিনের বিরোধপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দ্বিতীয় দফার এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে সুইজারল্যান্ডের ঐতিহাসিক শহর জেনেভা-তে। আগামী মঙ্গলবার নির্ধারিত এই বৈঠক ঘিরে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম Axios-এর বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধের সম্ভাবনা এড়ানো এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানোই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী বিরোধগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারমাণবিক ইস্যু। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন অভিযোগ করে আসছে, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের আড়ালে সামরিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি কেবল জ্বালানি ও বেসামরিক গবেষণার জন্য।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়, যখন যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার ঘোষণা দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একদিকে কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি আগ্রহ দেখালেও অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতির বার্তা দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিতেও তারা প্রস্তুত।

ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তি চান, তবে সেই চুক্তি হতে হবে কঠোর এবং কার্যকর। তিনি সরাসরি সতর্ক করে বলেন, “চুক্তি হবে, না হলে আগের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী ওই অঞ্চলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন, যা স্পষ্টভাবে সামরিক চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

জেনেভার এই বৈঠকে অংশ নিতে যাচ্ছে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। মার্কিন প্রতিনিধি দলে থাকবেন ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

এই সংলাপে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরপেক্ষ কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত ওমান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি সরাসরি দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং আলোচনার কাঠামো তৈরিতে কাজ করছেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্টিভ উইটকফ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে ইরানের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠান। পরে ওমান একটি লিখিত প্রস্তাব তৈরি করে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি-র কাছে হস্তান্তর করে। লারিজানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই নথি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন, যা আলোচনার অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। একদিকে সামরিক শক্তি প্রদর্শন, অন্যদিকে কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে ইরানকে একটি চুক্তিতে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। এই কৌশলটি নতুন নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর প্রয়োগ আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ইরানের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, যতদিন ইরান নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে, ততদিন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে। তবে ইরান বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এটিকে তাদের সার্বভৌম অধিকারের অংশ বলে উল্লেখ করেছে।

একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরানে শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “এটা হলে হয়তো সবচেয়ে ভালো হতো।” যদিও এই মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেও আব্বাস আরাঘচি ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। ওই বৈঠকটি ছিল পরোক্ষ, যেখানে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন।

প্রথম দফার আলোচনার পর ইরান সন্তোষ প্রকাশ করে। আব্বাস আরাঘচি বলেন, এই আলোচনা একটি ভালো সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, উভয় পক্ষ তাদের নিজ নিজ অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে বদর আল বুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, এই আলোচনা ছিল অত্যন্ত গুরুতর এবং ফলপ্রসূ। তিনি জানান, এর মাধ্যমে দুই দেশের চিন্তাভাবনা পরিষ্কার হয়েছে এবং সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা গেছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জেনেভার দ্বিতীয় দফার বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। কারণ এই বৈঠকের ফলাফল শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমে আসতে পারে এবং একটি নতুন চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বজুড়ে এখন নজর জেনেভার এই বৈঠকের দিকে। যুদ্ধের আশঙ্কা ও কূটনৈতিক আশার এই সন্ধিক্ষণে দুই দেশ কতটা নমনীয় অবস্থান নেয় এবং কতটা বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই আলোচনার মাধ্যমে যদি একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া যায়, তাহলে তা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হয়ে আসবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনিশ্চয়তা এবং উত্তেজনার মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত